- পাটকাঠি থেকে পরিবেশবান্ধব ছাপার কালি তৈরির পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছেন একদল বাংলাদেশি গবেষক। শিল্প খাতে আমদানিনির্ভর উপকরণের ওপর দেশটির নির্ভরতা কমাতে পারে এই উদ্ভাবন।
- ছাপার কালির সবটাই আমদানি করতে হয় বাংলাদেশকে। যার বার্ষিক বাজার মূল্য প্রায় ২৪৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। গবেষণা বলছে, পাটভিত্তিক ছাপার কালি তৈরি করতে পারলে, উৎপাদন খরচ আমদানি খরচের তুলনায় প্রায় ১০ ভাগের এক ভাগে নামিয়ে আনা সম্ভব।
- নতুন এই উদ্ভাবনে ব্যবহার করা হয়েছে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়া। যেখানে বায়োমাস পাইরোলাইসিসের (biomass pyrolysis) সময় উৎপন্ন ক্ষতিকর গ্যাস পুনর্ব্যবহার করা হয়।
- শুধু ছাপার কালি নয়, গবেষকরা পাটকাঠি থেকে গ্রাফিনও তৈরি করেছেন। আশার কথা হলো, এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে বৈশ্বিক ন্যানোম্যাটেরিয়াল বাজারেও প্রবেশ করতে পারবে।
একটা সময় ছিল যখন বাংলাদেশের রপ্তানী আয়ের অন্যতম উপায় ছিল পাট। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই দেশটিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় পাটকল আদমজি জুট মিল। নানা রকম রাজনৈতিক ভুল সিদ্ধান্ত ও অবহেলায় ধুকছে এই খাত। তবে পরিবেশ বিবেচনায় পাটের গুরুত্ব এখনো সমাদৃত।
বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাট উৎপাদনকারী দেশ এবং পাট রপ্তানিতে শীর্ষস্থানীয়। দেশটিতে এর পরিচিতি “সোনালী আঁশ” নামে। গ্রামাঞ্চলে শুকনো পাটকাঠি প্রায়ই রান্নার জ্বালানি হিসেবে পোড়ানো হয়। কখনও কখনও কম খরচের বেড়া তৈরিতে ব্যবহার করা হয় এই পাটকাঠি। মোটা দাগে এটিকেই কৃষি বর্জ্য হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। এবার গবেষকরা দেখিয়েছেন, এই কৃষি বর্জ্যের মাধ্যমে তৈরি হতে পারে ছাপার কালি। যা আমদানি করা কালির বিকল্প হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি করছে।
বাংলাদেশি নেতৃত্বাধীন ওই গবেষক দলটি, অবহেলিত এই পাটকাঠিকে প্রথমে সাবমাইক্রন কার্বন কণায় পরিণত করেন। পরে এটি ব্যবহার করে বানানো হয় পরিবেশবান্ধব কালি। আমদানি করা বাণিজ্যিক কালো কালির বিকল্প হতে পারে এটি। এর উৎপাদন খরচও অনেক কম। ফলে কমে আসবে আমদানী খরচ, সাশ্রয় হবে বৈদেশিক মুদ্রা।
২০২২ সালে Chemistry: An Asian Journal-এ প্রকাশিত গবেষণাটির নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী মো. আবদুল আজিজ। তিনি সৌদি আরবের King Fahd University of Petroleum and Minerals (KFUPM)-এ গবেষক হিসেবে কাজ করছেন। তিনি বলেন, “আমরা কম মূল্যের বায়োমাসকে উন্নত শিল্প উপকরণে রূপান্তর করার চেষ্টা করছি।”
“তবে যখন আমরা পাটকাঠি দিয়ে পরীক্ষা করি, আমরা খুব অবাক হই। কারণ পাটকাঠি থেকে আমরা আরও ভালো মানের কালি পেয়েছি, এবং এটি আমদানি খরচের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ খরচ কমাতে পারে।”
আজিজ জানান, “বাংলাদেশ প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ পাটকাঠি উৎপাদন করে। দেশটিতে কাঁচা পাট উৎপাদন কখনো কখনো বছরে ৯ মিলিয়ন বেল বা প্রায় ১ দশমিক ৬ মিলিয়ন টনে পৌঁছায়। এগুলোকে টেকসই প্রযুক্তির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারি আমরা।”

ব্যয়বহুল কালি আমদানির বাজার
বাংলাদেশের ছাপাখানা ও প্যাকেজিং শিল্প, দ্রুত সম্প্রসারিত উৎপাদন ও প্রকাশনা খাত। এই শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ছাপার কালি, যা পুরোটাই আমদানি করতে হয়।
প্রিন্টিং ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ -এর হিসাব অনুযায়ী, বার্ষিক ছাপার কালির আমদানি মূল্য প্রায় ২৪৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। দেশী মুদ্রায় যা ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি। এই বাজারের মধ্যে রয়েছে সংবাদপত্র ছাপা, প্যাকেজিং, প্রকাশনা, অফিস প্রিন্টিং এবং কলম উৎপাদন। চীন, জাপান, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া এবং নেদারল্যান্ডস থেকে আমদানি করা হয় বেশিরভাগ কালি ও কাঁচামাল। অ্যাসোসিয়েশনের দেয়া তথ্য থেকে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রায় ১৫ হাজার ছাপাখানা, বছরে প্রায় ১৬৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ২ হাজার কোটি টাকার বেশি খরচ করে থাকে ছাপার কালি আমদানীতে।
এর পাশাপাশি লেজার ও ইঙ্কজেট প্রিন্টারের জন্য প্রতি বছর আরও প্রায় ৭০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৮৬০ কোটি টাকার কালি আমদানি করতে হয়। কলম শিল্পের জন্যও বিশেষায়িত কালি আমদানি করা হয়।
চাহিদা বাড়লেও, উচ্চমানের কার্বনভিত্তিক কালি উপকরণ উৎপাদনে বাংলাদেশের নিজস্ব শিল্পভিত্তি প্রায় নেই বললেই চলে।
পাট থেকে কালি তৈরির প্রক্রিয়া
২০২২ সালের গবেষণায়, বিশেষভাবে তৈরি পাইলট ফার্নেস ব্যবহার করে পাটকাঠির পাইরোলাইসিস করেন গবেষকরা। পাইরোলাইসিস হলো অক্সিজেনের পরিমিত উপস্থিতিতে, উচ্চ তাপে জৈব পদার্থ ভেঙে কার্বনজাত উপাদান তৈরি করার প্রক্রিয়া। এই ফার্নেস প্রক্রিয়ার সময় উৎপন্ন ক্ষতিকর গ্যাস পুনর্ব্যবহার করে আবার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ফলে পরিবেশে কার্বনের নির্গমনও কমে আসে। কমায় পরিবেশের ক্ষতি।
প্রথমে পাটকাঠি পুড়িয়ে বা বিশেষ প্রক্রিয়ায় যে কার্বন পাওয়া যায়, সেটিকে একটি বিশেষ যন্ত্রে (বল-মিলিং) খুব ভালোভাবে গুঁড়া করা হয়। এরপর খুব ছোট ছোট কণায় পরিণত করা হয় এগুলোকে। এই কণাগুলো এতই ছোট যে খালি চোখে দেখা যায় না। পরে পানি ও আরও কিছু নিরাপদ তরল পদার্থের সঙ্গে এগুলোকে মিশিয়ে এমন একটি মিশ্রণ তৈরি করা হয়, যা প্রিন্টার বা ছাপার কালি হিসেবে ব্যবহার করা যায়।
গবেষক দল একটি ক্যানন প্রিন্টার ব্যবহার করে কালির কার্যকারিতা পরীক্ষা করেন। এতে দেখা যায়, তাদের তৈরি কালি দিয়ে ছাপার মান বাণিজ্যিক কালো ইঙ্কজেট কালির মতোই। UV-Vis spectroscopy (কোনো নমুনা কতটুকু অতিবেগুনি (UV) ও দৃশ্যমান আলো শোষণ বা ভেদ করে যেতে দেয়, তা পরিমাপ করার পদ্ধতি) পরীক্ষাতেও দেখা যায়, পাটকাঠি থেকে তৈরি কালি এবং আমদানি করা বাণিজ্যিক কালির কালো রংয়ের গভীরতা ও আলো পার হওয়ার মাত্রা খুব কাছাকাছি।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, পাটকাঠির কালি স্থিতিশীল এবং দীর্ঘ সময় ধরে একই ধরনের ছাপার কার্যকারিতা থাকে এটি ব্যবহারে।

পাটকাঠির কালি তুলনামূলক পরিবেশবান্ধব
এই কালি উদ্ভাবনের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো, প্রচলিত কার্বন ব্ল্যাকের চেয়ে পাটকাঠির কালি উৎপাদন পরিবেশবান্ধব।
বাণিজ্যিক কালো প্রিন্টিং কালি মূলত কার্বন ব্ল্যাকের ওপর নির্ভরশীল। কার্বন ব্ল্যাক হলো পেট্রোলিয়ামজাত উপাদান, যা তৈরি করতে শক্তিনির্ভর শিল্প প্রক্রিয়া লাগে এবং এতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়।
আবদুল আজিজের গবেষক দল বলছে, পাটকাঠি থেকে তৈরি কার্বন তুলনামূলকভাবে বেশি টেকসই বিকল্প হতে পারে।
গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, প্রচলিত বায়োমাস পাইরোলাইসিসে মিথেন, কার্বন মনোক্সাইড এবং হাইড্রোজেনের মতো ক্ষতিকর গ্যাস নির্গত হতে পারে। এই নির্গমন কমাতে গবেষক দল তাদের পাইলট ফার্নেস এমনভাবে তৈরি করেন, যাতে উৎপাদনের সময় এসব গ্যাস সরাসরি বাতাসে ছেড়ে না দিয়ে পুনর্ব্যবহার ও পোড়ানো যায়।
মো. আবদুল আজিজ আরো বলেন, “নবায়নযোগ্য বায়োমাস ব্যবহার করে জীবাশ্মভিত্তিক কাঁচামালের বিকল্প তৈরির এই প্রযুক্তি, বৃহত্তর সবুজ শিল্প আন্দোলনের অংশ। এবং এই উন্নয়নকে পরিবেশবান্ধব সবুজ প্রযুক্তি হিসেবে বিবেচনা করা যায়। বেশিরভাগ প্রচলিত ফার্নেস এই ক্ষতিকর গ্যাসগুলো পরিবেশে ছেড়ে দেয়। তাই যখন কোনো প্ল্যান্ট পাইরোলাইসিসের সময় উৎপন্ন গ্যাসগুলোকে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করে, তখন পরিবেশে ক্ষতির পরিমান কমে আসে।”
পাটকাঠি থেকে কালি তৈরির প্রাথমিক প্রকল্প সম্পর্কে আব্দুল আজিজ বলেন, “বাংলাদেশ এই শিল্পের জন্য উপযুক্ত জায়গা। এখানে যখন পাট প্রক্রিয়াজাত করা হয়, তখন পাটের ক্ষতিকর উপাদানগুলো দূর হয়ে যায়। তাই পাট থেকে সবচেয়ে ভালো মানের প্রিন্টিং কালি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে এখানে। এ জন্য ভালো মানের একটি বল-মিলিং মেশিন কিনলেই খুব সহজে এই কালি উৎপাদন করা সম্ভব।”
তিনি আরও বলেন, “যদি কোনো প্রতিষ্ঠান পাটকাঠি থেকে প্রিন্টিং কালি তৈরি করার চেষ্টা করে, তাহলে কালি উৎপাদনের খরচ আমদানি করা কালির তুলনায় প্রায় ১০ গুণ কম হবে।”
ব্যয়বহুল গ্রাফিনের স্বপ্ন
মো. আব্দুল আজিজের গবেষক দল বলছে, এই গবেষণা আরেকটি ব্যয়বহুল উপাদান গ্রাফিনের ক্ষেত্রেও আশা দেখাচ্ছে। ২০২২ সালে সমসাময়িক আরেক গবেষণায় দেখানো হয়, পাটকাঠি গ্রাফিনের মতো উন্নত কার্যকরী উপাদানের উৎস হতে পারে।
২০০৪ সালে আবিষ্কৃত গ্রাফিনকে, একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম সম্ভাবনাময় শিল্প উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এটি কার্বন পরমাণুর একক স্তর দিয়ে তৈরি, যেখানে পরমাণুগুলো মৌচাকের মতো জালে সাজানো থাকে। বৈদ্যুতিক পরিবাহিতায় বিশেষ ক্ষমতা সম্পন্ন, নমনীয়তা এবং তাপ পরিবাহিতার জন্য গ্রাফিন আলাদাভাবে পরিচিত।
এই গবেষণায় গবেষকরা প্রথমে গুঁড়া করা পাটকাঠিকে সক্রিয় কার্বন ন্যানোশিটে রূপান্তর করেন। এরপর নিষ্ক্রিয় পরিবেশে উপাদানটিকে প্রায় ২ হাজার ৭০০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৪ হাজার ৮৯২ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপে উত্তপ্ত করা হয়। এর ফলে তৈরি হয় ত্রি-মাত্রিক আন্তঃসংযুক্ত গ্রাফিন কাঠামো। যার বিশুদ্ধতা বেশি, ত্রুটির মাত্রা কম এবং রয়েছে কাঠামোগত শক্তিশালী স্থিতিশীলতা।
বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন শিল্প খাত যেমন ব্যাটারি, সেমিকন্ডাক্টর, কন্ডাক্টিভ ইঙ্ক, চিকিৎসা যন্ত্র, মহাকাশ উপকরণ, পানি বিশুদ্ধকরণ ব্যবস্থা, ইলেকট্রনিক্স পণ্য এবং উচ্চগতির যোগাযোগ প্রযুক্তিতে বাণিজ্যিকভাবে গ্রাফিন ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে শিল্প পর্যায়ে গ্রাফিন উৎপাদন এখনো ব্যয়বহুল এবং প্রযুক্তিগতভাবে বেশ জটিল। শিল্প খাতের হিসাব বলছে, বৈশ্বিক গ্রাফিন বাজার ২০২৫ সালে প্রায় ১ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। এই প্রবৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রাখবে ইলেকট্রনিক্স পণ্য, টেলিযোগাযোগ, মহাকাশ, জ্বালানি সংরক্ষণ এবং সেমিকন্ডাক্টর খাত।
“আমি বিশ্বাস করি, প্রচুর বায়োমাস বা পাটের প্রাচুর্যের কারণে বাংলাদেশ সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতে পারে,” বলেন আব্দুল আজিজ। তিনি মনে করেন, “সরকার ও করপোরেশনগুলো উন্নত উপাদান এবং সেমিকন্ডাক্টর-সম্পর্কিত প্রযুক্তিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করায় বৈশ্বিক গ্রাফিন বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। এখানে বাংলাদেশ সরকার বড় সুযোগ নিতে পারে।”
এই গবেষণা তাই শুধু পাটের বর্জ্য ব্যবহারের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের জন্য কালি আমদানি নির্ভরতা কমানোরও সুযোগ। এছাড়া পরিবেশবান্ধব উৎপাদন বাড়ানো এবং ভবিষ্যতে উচ্চমূল্যের ন্যানোম্যাটেরিয়াল বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনার গল্পও এই গবেষণা।
ব্যানার ছবি: এক বাংলাদেশী, পাট পরিবহন করে নিয়ে যাচ্ছেন গন্তব্যে। বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাট উৎপাদনকারী দেশ এবং রপ্তানিতে শীর্ষে।ছবি: by Mahinur11 via Wikimedia Commons (CC BY-SA 4.0).
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ ২০২৬ সালের ১১ জুন।