- বাসেল কনভেনশনে স্বাক্ষরকারী দেশ এবং নিজস্ব জাতীয় ই-বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা থাকা সত্ত্বেও, বাংলাদেশ এই খাতে এখন নিট আমদানিকারক।
- জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে ই-বর্জ্য আমদানি করেছে ৪০টি প্রতিষ্ঠান। আইন প্রয়োগে দুর্বলতা ও নজরদারির অভাবেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
- ইলেকট্রনিক পণ্যের পুনর্ব্যবহার (Recycling) সক্ষমতা তেমন একটা নেই দেশটিতে। তার ওপর ই-বর্জ্য আমদানিতে রয়েছে দুর্বল তদারকি। ফলে বেড়েই চলেছে অবৈধ আমদানি।
বাংলাদেশে ইলেকট্রনিক বর্জ্যের অবৈধ আন্তঃসীমান্ত বাণিজ্য, নিট আমদানি ভারসাম্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। দুর্বল নজরদারির কারণে এই খাতে নিট আমদানিকারকে পরিণত হয়েছে দেশটি।
ই-বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশে নিজস্ব আইন রয়েছে। বাসেল কনভেনশনেরও সদস্য দেশটি। এ ছাড়া ২০২১ সালে (ই-বর্জ্য) ব্যবস্থাপনা বিধিমালা) প্রণয়নও করা হয়েছে।
তবে এসব আইনি কাঠামোর বাস্তবায়ন এখনো দুর্বল।
মঙ্গাবে, বাংলাদেশের ই-বর্জ্য আমদানি ও রপ্তানি সংক্রান্ত একটি নথি পর্যালোচনা করেছে। এই বাণিজ্যের প্রবাহ এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার বিভিন্ন দুর্বলতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরেছে এটি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) ওই নথি অনুযায়ী, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে ৪০টি প্রতিষ্ঠান এইচএস (HS) কোড ৮৫৪৯-এর আওতায় ই-বর্জ্য আমদানি করেছে। আন্তর্জাতিক কাস্টমস ব্যবস্থায় ই-বর্জ্য বাণিজ্যের জন্য ব্যবহৃত এই কোডের আওতায় আমদানি কার্যক্রম বাসেল কনভেনশনের পরিপন্থী। বাসেল কনভেনশন হলো সাক্ষরকারী দেশগুলোর মধ্যে বিপজ্জনক বর্জ্যের লেনদেন কমানোর লক্ষ্যে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি।
যারা ই-বর্জ্য আমদানি করছে তাদের মধ্যে বস্ত্র ও পোশাকশিল্প খাতের আমদানীকারকই সবচেয়ে বেশি। মোট আমদানির ২৭ শতাংশ বা প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই অংশ থেকে আসে।
আমদানিকারকদের ভাষ্য
মঙ্গাবে ৪০টি ই-বর্জ্য আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেডের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
ইউনিলিভার বাংলাদেশ লিমিটেডের করপোরেট অ্যাফেয়ার্স, পার্টনারশিপস অ্যান্ড কমিউনিকেশনস বিভাগের পরিচালক শামীমা আখতার ২১ মে ই-মেইলের উত্তর দেন। তিনি মঙ্গাবে-কে বলেন, “আমরা নিশ্চিত করছি যে, কোনো ই-বর্জ্য বা নিষিদ্ধ পণ্য আমদানি করিনি আমরা। সংশ্লিষ্ট যে পণ্য নিয়ে আপনাদের প্রশ্ন সেগুলো একটি লোড সেল বা সূক্ষ্ম পরিমাপক যন্ত্র।এর এইচএস কোড ৯০৩১৮, যা আমাদের আমদানি নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। শুল্কায়ন প্রক্রিয়ার সময় এইচএস কোড ৮৫৪৯ হয়ে থাকলে, তা কাস্টমস কর্তৃপক্ষের মাধ্যমেই হয়ে থাকবে।”
স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেড, হজরত আমানত শাহ স্পিনিং মিলস, শাহ সিমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড এবং বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনসহ যেসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মঙ্গাবে যোগাযোগ করেছিল, তারা প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত কোনো জবাব দেয়নি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকেও মঙ্গাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পায়নি, এ বিষয়ে।

অবৈধ আমদানি ও বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতা
এনবিআর নথির তথ্য এবং বেসরকারি সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (TIB) এক গবেষণার ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এইচএস ৮৫৪৯ কোডের আওতায় প্রায় ৭ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করা হয়েছে।
একই সময়ে ই-বর্জ্য ও স্ক্র্যাপ বা ভাঙারি আমদানি হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার ৯৮৫ টন। বিপরীতে রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৪ হাজার ৪০ টন প্রিন্টেড সার্কিট বোর্ড (PCB) ও স্ক্র্যাপ।
টিআইবির গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে- অন্য এইচএস কোড ব্যবহার করে ভুল পণ্যের ঘোষণা দেওয়ার সুযোগ থাকায়, প্রকৃত পরিমাণ এর চেয়েও বেশি হতে পারে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের (DOE) অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. জিয়াউল হক বলেন, নির্দিষ্ট এইচএস কোড ব্যবহার করে ঘোষিত আমদানি চ্যানেলের মাধ্যমে অবৈধ ই-বর্জ্য বাণিজ্য উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী কেবল প্রয়োজনীয় এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নয় এমন ই-বর্জ্য আমদানির অনুমতি রয়েছে। এ বিষয়ে আরও কঠোর যাচাই-বাছাই প্রয়োজন।
“ই-বর্জ্যের নামে কী ধরনের পণ্য দেশে আসছে, তা আরও গভীরভাবে অনুসন্ধান ও তদন্ত করা দরকার”, বলেন হক।
পরিবেশগত ঝুঁকির কারণে পুরনো ফ্রিজের মতো কিছু পণ্যের আমদানি এরইমধ্যে নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
হক জানান, কিছু বর্জ্য নতুন করে সারিয়ে, ব্যবহার উপযোগী করার কারিগরি দক্ষতা নেই বাংলাদেশের। এরকম একটি পণ্য সার্কিট বোর্ড। তাই জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, স্পেন ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে রপ্তানির অনুমতি রয়েছে এটির।
দুর্বল যাচাইবাছাই ও অনানুষ্ঠানিক অর্থ লেনদেন
পুননির্মাণ (Refurbish) করা যায় এমন ইলেকট্রনিক পণ্য এবং ই-বর্জ্য আমদানি আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ বাংলাদেশে। টিআইবির গবেষণা বলছে, তারপরও এ ধরনের চালান শনাক্ত করার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায়, সেগুলো এখন দেশে সহজেই প্রবেশ করছে।
গবেষণাটিতে আরো বলা হয়েছে, অবৈধ বানিজ্য চালিয়ে যেতে আরো বেশ কয়েকটি অনৈতিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হতে হতে হয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে। লাইসেন্স পাওয়া বা আইন ফাঁকি দিয়ে অবৈধ আর্থিক লেনদেন যেগুলোর মধ্যে অন্যতম।
বেসরকারি সংস্থা Environment and Social Development Organization (ESDO)-এর জ্যেষ্ঠ কারিগরি উপদেষ্টা শাহরিয়ার হোসেন মঙ্গাবে-কে বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) অধীন কাস্টমস কর্তৃপক্ষ এবং পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE) উভয়েই ই-বর্জ্যের অবৈধ বাণিজ্য সম্পর্কে জানে, তবে আইন প্রয়োগ এখনো দুর্বল।
তিনি বলেন, “বাসেল কনভেনশন, আন্তঃসীমান্ত বিধিমালা এবং স্থানীয় আইন অনুযায়ী, ই-বর্জ্য আমদানি নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।”
পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায়, এখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করেন হোসেন।

হোসেন আরও বলেন, খুব কম দামে বিক্রি হওয়া পুরনো ও পুননির্মাণ করা ল্যাপটপসহ নানা রকম ইলেকট্রনিক পণ্য এখনো বাজারে সহজলভ্য, যা অবৈধ আমদানি অব্যাহত থাকার প্রমাণ দেয়। আইনের দুর্বলতার কারণে অনানুষ্ঠানিক ই-বর্জ্য পুনর্ব্যবহার খাত বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি।
“ই-বর্জ্যের বিপজ্জনক ভারী ধাতুগুলো পরিবেশ ও খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করছে এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের খাবারের টেবিলে পৌঁছে যাচ্ছে এগুলো। এটি বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত সংকট,” বলেন হোসেন।
নজরদারি ঘাটতি ও আইন প্রয়োগে দুর্বলতা
টিআইবির (TIB) গবেষণা সহযোগী আবদুল্লাহ জাহিদ ওসমানী বলেন, আইনের প্রয়োগ দুর্বলতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। এ কারণে বিদ্যমান আইন ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার থাকা সত্ত্বেও ইলেকট্রনিক বর্জ্য বাংলাদেশে প্রবেশ করছে বলে মনে করেন তিনি।
ওসমানী বলেন, “প্রায় ৯০ শতাংশ আমদানি চালান, কেবল প্রাথমিক যাচাইয়ের মধ্য দিয়ে কাস্টমস ছাড়পত্র পায়। আর প্রত্যক্ষ পরিদর্শনের আওতায় আসে মাত্র ১০ শতাংশ চালান।”
ওসমানী আরও বলেন, ব্যবহৃত বা পুননির্মাণ করা ইলেকট্রনিক পণ্য শনাক্ত করতে, কাস্টমস কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নেই।
এছাড়া, কাস্টমস রেকর্ড এবং পরিবেশগত ছাড়পত্র ব্যবস্থার মধ্যে অসঙ্গতিও বড় ধরনের নজরদারি ঘাটতিকে নির্দেশ করছে। ফলে আইনের ফাঁকফোকর এবং ভুল ঘোষণার মাধ্যমে ই-বর্জ্য দেশে প্রবেশ করছে সহজেই। তাই পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC), কাস্টমস কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে আরও কার্যকর সমন্বয়ের আহ্বান জানান ওসমানী।
ব্যানার ছবি: সীমিত পুনর্ব্যবহার সক্ষমতা এবং দুর্বল নজরদারি বাংলাদেশে অবৈধ ই-বর্জ্য আমদানি ও অনানুষ্ঠানিক পুনর্ব্যবহার কার্যক্রমকে উৎসাহিত করছে। ছবি: Pixabay.
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ ২০২৬ সালের ৯ জুন।