- ‘দূষণকারীই বহন করবে ক্ষতিপূরণের দায়’ (Polluter Pays Principle বা PPP), এই নীতি বাংলাদেশে নতুন নয়। তবে যারা পরিবেশ দূষণ করছে, এখনো তারা রয়ে যাচ্ছে জবাবদিহির বাইরে। মূলত কাগজ-পত্রেই সীমাবদ্ধ এই নীতি।
- গত ১৬ বছরে আরোপিত মোট ক্ষতিপূরণের মাত্র ৪৭ দশমিক ৫২ শতাংশ আদায় করতে পেরেছে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ।
- আইনের ফাঁকফোকর, দূষণের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে দুর্বলতা, আইন কর্মকর্তার স্বল্পতা এবং মামলার দীর্ঘসূত্রতাকে এর জন্য দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।
১৯৯২ সালের রিও ঘোষণাপত্রে সমর্থন জানায় বাংলাদেশ। এই ঘোষণাপত্রের উল্লেখযোগ্য শর্ত হলো ‘পরিবেশ দূষণকারীই বহন করবে ক্ষতিপূরণের দায়’ (PPP)। তবে সেই শর্ত স্বাক্ষরের বছর থেকেই এই নীতি পড়ে রয়েছে শুধুই কাগজে-কলমে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু এক বক্তব্যে জানান “গত ১৬ বছরে দূষণকারীদের ওপর আরোপিত মোট ক্ষতিপূরণের আদায় করা গেছে অর্ধেকেরও কম। এই নীতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতার দায় পরিবেশ শাসনব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা।”
মন্ত্রী উল্লেখ করেন, নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের আদেশের বিরুদ্ধে আপিলের অধিকার প্রয়োগ, এই নীতি বাস্তবায়নের অন্যতম অন্তরায়। এতে দূষণকারীরা ক্ষতিপূরণ আদায়ের প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করার সুযোগ পায়।
বিষয়টি নিয়ে মঙ্গাবে বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলে। তাদের বক্তব্য, বিচারব্যবস্থার ফাঁকফোকর, দূষণসংক্রান্ত প্রমাণ ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের দুর্বলতা এবং দূষণকারীদের প্রভাব PPP বাবস্তবায়ন করতে দেয় না। বাংলাদেশ যদি সত্যিই নীতিটি বাস্তবায়ন করতে চায়, তাকে অবশ্যই এসব বাস্তবতা মোকাবিলা করেই তা করতে হবে।
পরিবেশবিদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ফিরোজ জামান মঙ্গাবে-কে বলেন, “দূষণকারীদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগে ধীরগতি পরিবেশ দূষণকে আরও বাড়িয়ে তোলে। ফলে ভেস্তে যায় পরিবেশগত ন্যায়বিচারের আশা।”

ক্ষতিপূরণ আদায়ে ব্যর্থতা, নীতিটিকে দুর্বল করছে
PPP অনুযায়ী, যারা পরিবেশের ক্ষতি করবে সেসব দূষণকারীকেই সেই ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিকারের ব্যয় বহন করতে হবে।
১৯৭২ সালে অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (OECD) সম্মেলনের সুপারিশে প্রথম এই ক্ষতিপূরণ নীতির ধারণার উল্লেখ করা হয়। এরপর ১৯৭৪ সালে পুনর্ব্যক্ত করা হয় এই নীতি।
১৯৯২ সালে রিও ডি জেনেইরোতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের পরিবেশ ও উন্নয়ন বিষয়ক ঘোষণা পত্রের ১৬ নম্বর নীতিত PPP অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশও ওই ঘোষণাপত্রের স্বাক্ষরকারী একটি দেশ।
১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ৭ ধারার মাধ্যমে এই নীতিকে আইনে অন্তর্ভুক্ত করে বাংলাদেশ। কোনো ব্যক্তি বা শিল্প প্রতিষ্ঠান সরাসরি অথবা পরোক্ষভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি করলে, ক্ষতিপূরণ হিসেবে জরিমানা আরোপ করতে পারবে পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE)। এর মহাপরিচালককে এই ক্ষমতা দিয়ে নীতিটি আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
এছাড়া, DoE মহাপরিচালক দূষণকারীদের সংশোধনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিতে পারেন এবং তারা তা না মানলে তাদের বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা করতে পারেন তিনি। ১৯৯৫ সালের পরিবেশ সংরক্ষণ আইন (২০১০ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী DoE পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং ক্ষতিপূরণ আরোপ করে।
গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে দেওয়া মিন্টুর বক্তব্য দেখিয়ে দেয়, কীভাবে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি PPP বাস্তবায়নে ব্যর্থ হচ্ছে।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের ১৩ জুলাই থেকে ২০২৬ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত সারা দেশের ১৮ হাজার ৬১৭টি দূষণকারী প্রতিষ্ঠানের ওপর ৬২২ কোটি ৮০ লাখ টাকা (প্রায় ৫ কোটি ৭৬ লাখ মার্কিন ডলার) ক্ষতিপূরণ আরোপ করে DoE।
তবে ১৬ বছরে আরোপিত মোট ক্ষতিপূরণের মাত্র ৪৭ দশমিক ৫২ শতাংশ আদায় করা গেছে।

কম আদায়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মিন্টু বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের ১৪ ধারা অনুযায়ী DoE আরোপিত ক্ষতিপূরণের আদেশের বিরুদ্ধে দূষণকারীরা আপিল করার অধিকার রাখেন। এসব আবদেনকারীর অধিকাংশই শিল্পমালিক।
মন্ত্রী আরও বলেন, এই আবেদনগুলো এখনো আপিল কর্তৃপক্ষের কাছে বিচারাধীন। এসব আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত আরোপিত ক্ষতিপূরণ অনাদায়ী থাকবে।
বিধি অনুযায়ী, DoE আরোপিত ক্ষতিপূরণের বিরুদ্ধে আপিল শুনানি করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিবের নেতৃত্বাধীন আপিল কর্তৃপক্ষ।
মন্ত্রণালয়ের পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও আইন শাখার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গত মে মাসে মঙ্গাবে-কে জানান, বর্তমান সরকার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার আগে আপিল কর্তৃপক্ষের কাছে ৫৭৭টি আপিল বিচারাধীন ছিল।
আপিল দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য মন্ত্রীর নির্দেশনার পর মে মাসের মধ্যে সেই জট কমে ৪৫০টির নিচে নেমে আসে।

আইনের ফাঁকফোকরেই আছে দায়মুক্তি
বিধি অনুযায়ী, DoE আরোপিত ক্ষতিপূরণে ক্ষুব্ধ কোনো পক্ষ, আদেশ জারির ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে পারবে। তবে তার আগে আবেদনকারীকে ক্ষতিপূরণের ২৫ শতাংশ জমা দিতে হয় সরকারি কোষাগারে।
DoE কর্মকর্তারা বলেন, অভিযুক্ত দূষণকারীরা আপিল কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করার পরিবর্তে সরাসরি হাইকোর্টে রিট আবেদন করে ক্ষতিপূরণের আদেশ চ্যালেঞ্জ করে। ফলে হাইকোর্ট ওই রিট নিষ্পত্তি না করা পর্যন্ত, আরোপিত ক্ষতিপূরণ অনাদায়ী থেকে যায়।
বাংলাদেশ সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, পরিবেশ দূষণের ক্ষতিপূরণের মতো কোনো সরকারি আদেশে ক্ষুব্ধ হলে, যে কোনো নাগরিক হাইকোর্টে রিট আবেদন করতে পারেন।
তবে বর্তমানে রিট আবেদন এবং DoE-এর করা কতগুলো মামলা বিচারাধীন রয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা জানা যায়নি।
DoE-এর একজন পরিচালক (আইন) এ কে এম কামরুজ্জামান আলী মঙ্গাবে-কে বলেন, “আমাদের দায়িত্ব শুধু অভিযোগপত্র জমা দেওয়া পর্যন্ত। এরপর কতগুলো মামলা বিচারাধীন রয়েছে, তা জানার জন্য কোনো ‘ওয়ান-স্টপ ডেস্ক’ নেই।”
২০১০ সালে সংশোধিত পরিবেশ সংরক্ষণ আইন সরকারকে পরিবেশ বিষয়ক মামলার জন্য বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এবং প্রতিটি জেলায় পরিবেশ আদালত প্রতিষ্ঠার ক্ষমতা দেয়।
২০০২ সালে ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুটি পরিবেশ আদালত প্রতিষ্ঠা হয়। পরে ২০১০ সালের আইনের অধীনে পুনর্গঠিত হয় সেগুলো। তবে ২০১০ সালের আইন কার্যকর হওয়ার পর আর কোনো নতুন আদালত প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে DoE-এর কয়েকজন কর্মকর্তা মঙ্গাবে-কে বলেন, প্রভাবশালী দূষণকারীরা সরাসরি হাইকোর্টে গিয়ে DoE-এর সিদ্ধান্তের ওপর স্থগিতাদেশ নিয়ে আসেন। ফলে ক্ষতিপূরণ আদায় অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে যায়।

আইনি সক্ষমতার ঘাটতি ও দুর্বল দূষণ মূল্যায়ন
সাবেক ও বর্তমান DoE কর্মকর্তাদের অভিযোগ, সরকারের পক্ষ থেকে দুর্বল আইনগত প্রতিনিধিত্বের কারণে, অভিযুক্ত দূষণকারীরা প্রায়ই এমন স্থগিতাদেশ পেয়ে যান।
২০২২ সালে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (TIB) এক প্রতিবেদনে জানায়, পরিবেশ আদালতে অভিযোগপত্র সময়মতো দাখিল এবং সাক্ষী উপস্থাপনের ক্ষেত্রে DoE-এর ঘাটতি রয়েছে।
ওই প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, “নির্দিষ্ট কিছু আইনজীবীর বেশি আয় করার সুযোগ রাখতে, প্রয়োজনীয় সংখ্যক আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে।”
ঢাকাভিত্তিক NGO নেচার কনজারভেশন ম্যানেজমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক এস এম মনজুরুল হান্নান খান পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের একজন সাবেক অতিরিক্ত সচিব। তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোর পরিবেশ নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বিজ্ঞানসম্মতভাবে ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করে। এতে প্রকৃত দূষণকারীদের পক্ষে আইনি দায় এড়িয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
খান বলেন, “অন্যদিকে, বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো অনেক সময় আনুমানিক হিসেবের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করে। অর্থাৎ সাধারণ পর্যায়ের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে দূষণের মাত্রা নিরূপণ করা হয়।”
তার মতে, এ ধরনের মূল্যায়ন প্রায়ই বিচারিক পর্যালোচনায় টেকে না এবং অভিযুক্ত দূষণকারীদের জরিমানার বিরুদ্ধে স্থগিতাদেশ পাওয়ার সুযোগ করে দেয়।
এছাড়া বড় শিল্প দূষণকারীরা রাজনৈতিক ও আর্থিকভাবে প্রভাবশালী বলে উল্লেখ করেন খান। বলেন, এই ‘ক্ষমতা’ তাদের বিচারিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার সুযোগ দেয়।
তিনি PPP কঠোরভাবে বাস্তবায়নের জন্য পরিবেশ আইন সংশোধনের সুপারিশ করেন।
খান বলেন, “একই সঙ্গে পরিবেশ সংরক্ষণে উৎসাহ দিতে সরকারকে আইন মেনে চলা শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে পুরস্কৃত করা উচিত।”
ব্যানার ছবি: ঢাকায় ট্যানারির বর্জ্য থেকে নির্গত ধোঁয়ার মধ্যে একটি অস্থায়ী সেতু পার হচ্ছেন চলাচলকারীরা। ছবি: The Basel, Rotterdam and Stockholm Conventions via Flickr (CC BY-NC-SA 2.0).
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ ২০২৬ সালের ৪ জুন।