- ২০২৫ সালে, বনের পরিবেশ আছে এমন একটি আবদ্ধ এলাকায় অবমুক্ত করা হয় খাঁচায় পালিত ২০টি ময়ূর। প্রজাতিটিকে আবার বনে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ।
- কৃত্রিম বন্য পরিবেশে জন্ম নেয়া একমাত্র ছানাটির বয়স এখন ছয় মাস, এবং এটিকে প্রাকৃতিক বনে অবমুক্ত করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।
- বাংলাদেশ বন বিভাগ জানিয়েছে, চলতি বছর প্রজনন মৌসুমে আরও কয়েকটি ময়ূরের বাচ্চা জন্মাবে বলে আশা করছে তারা। সেগুলোকেও ধাপে ধাপে বনে অবমুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। ঢাকার উত্তরে মধুপুর জাতীয় উদ্যানটিকে অবমুক্তের জায়গা হিসেবে বেছে নিয়েছে বনবিভাগ।
- তবে সংরক্ষণবিদরা সতর্ক করে বলছেন, খাঁচায় পালিত ময়ূরকে বন্য পরিবেশে অবমুক্ত করার ঝুঁকিও রয়েছে। এর মাধ্যমে অন্যান্য বন্য প্রাণীর মধ্যে রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশংকাও করছেন তারা।
বনবিভাগ বলছে হারিয়ে যাওয়া ময়ূর, বনে ফেরানোর প্রকল্পটির কাজে অনেকদূর এগিয়েছেন তারা। গত বছর ‘soft release’ বা নিয়ন্ত্রিতভাবে বনের একটি নির্দিষ্ট সংরক্ষিত অংশে ছাড়া হয় বেশ কয়েকটি খাঁচায় পালিত ময়ূর। ময়ূরকে পুরোপুরি বন্য পরিবেশে অবমুক্ত করার প্রক্রিয়ার অংশ এই ‘soft release’। তবে বিশেষজ্ঞরা এই প্রকল্পটিতে তাড়াহুড়া না করার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের মতে, বাংলাদেশে প্রজাতিটি দীর্ঘদিন ধরে বন্য পরিবেশ থেকে বিলুপ্ত। ফলে খাঁচায় পালিত ময়ূরের পক্ষে, বনের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া সহজ হবে না।
বাংলাদেশ বন বিভাগ, ২০২৫ সালের মে মাসে খাঁচায় পালা ২০টি ভারতীয় নীলময়ূর (Pavo cristatus) মধুপুর জাতীয় উদ্যানের একটি আবদ্ধ এলাকায় স্থানান্তর করে। আর এটিতে সহযোগিতা করেছে বেসরকারি সংস্থা ক্রিয়েটিভ কনজারভেশন অ্যালায়েন্স। জাতীয় উদ্যানটি টাঙ্গাইল বন বিভাগের আওতাধীন।
পরে এদের মধ্যে থেকে ১২টি ডিম পাওয়া যায়। টাঙ্গাইল বন বিভাগের কর্মকর্তা আবু নাসের মোহসিন হোসেন জানান, এর মধ্যে ডিম ফুটে বের হয়েছে একটি বাচ্চা।
তিনি বলেন, “এখন ছানাটির বয়স ছয় মাস। এ বছর আমরা এই দল থেকে আরও ময়ূরের বাচ্চা পাওয়ার আশা করছি।”
“আমাদের পরিকল্পনা হলো, কেবল ছানাগুলোকেই বনে অবমুক্ত করা। কারণ তারা প্রাকৃতিক পরিবেশে বেড়ে উঠছে এবং ধীরে ধীরে মানিয়ে নিচ্ছে সেখানকার পরিবেশের সঙ্গে”, বলেন হোসেন।
হোসেন জানান, আবদ্ধ নির্দিষ্ট এলাকায় স্থানান্তরিত ২০টি ময়ূরকে পুরোপুরি বনে অবমুক্ত করা হবে না। বরং এগুলোকে ব্যবহার করা হবে প্রজননের উৎস (parent stock) হিসেবে ।

বাংলাদেশে ময়ূরের ইতিহাস
২০২৪ সালের একটি গবেষণা অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে, ময়ূর সুন্দর নান্দনিক হিসেবে পরিচিত বন্য পাখি।এমনকি ভারতের জাতীয় পাখি ময়ূর।
মাত্র কয়েক দশক আগেও ময়ূরের দুটি পরিচিত প্রজাতিই পাওয়া যেতো বাংলাদেশে। এর মধ্যে দেশের উত্তর ও মধ্যাঞ্চলের শাল বনগুলোতে (Shorea robusta) সবচেয়ে বেশি দেখা যেতো ভারতীয় নীলময়ূর (Pavo cristatus)। আর এশিয়ার আরেকটি প্রজাতি, সবুজ ময়ূর (Pavo muticus), টিকে আছে ইন্দোনেশিয়া, চীন ও মিয়ানমারে। এক সময় বাংলাদেশে এ প্রজাতিটির দেখা পাওয়া যেতো শুধু দেশটির পার্বত্য অঞ্চলে।
আবাসস্থল ধ্বংস এবং নির্বিচার শিকারের কারণে ২০১৫ সালে ভারতীয় ময়ূর ও সবুজ ময়ূরকে বাংলাদেশে আঞ্চলিকভাবে বিলুপ্ত (regionally extinct) ঘোষণা করা হয়।
ঐতিহাসিকভাবে ভারতীয় নীলময়ূরের প্রধান আবাস শালবন। তাই বনে অবমুক্তির জন্য বন বিভাগ শালবন সমৃদ্ধ মধুপুর জাতীয় উদ্যানকে বেছে নিয়েছে। তাদের আশা,এই পরিবেশে ময়ূর সবচেয়ে ভালোভাবে বন্য জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের বনে ময়ূর না থাকলেও দেশের বিভিন্ন চিড়িয়াখানা ও ব্যক্তিমালিকানাধীন খামারে এখনও দেখা যায় প্রজাতিটিকে।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (DLS) ব্যক্তিগতভাবে খাঁচায় ময়ূর পালনের অনুমতি দিয়ে থাকে। ২০২৪ সালের ওই গবেষণা অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঢাকা চিড়িয়াখানায় জন্ম নেয়া ময়ূর থেকে অন্তত ৪০০টি, দেশের বিভিন্ন ব্যক্তিমালিকানাধীন খামারে বিক্রি করেছে DLS।

প্রকল্পের ঝুঁকি ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
বাংলাদেশে বন্য পরিবেশে ময়ূরকে আবার ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
দেশটির জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মনিরুল এইচ. খান, আবদ্ধ এলাকায় রাখা ২০টি ময়ূরের প্রসঙ্গে বলেন, “এই ময়ূরগুলো খাঁচায় জন্মেছে এবং সেখানেই বড় হয়েছে। তাই বনে টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় সক্ষমতা তাদের নেই। বাস্তবতা হলো, তারা তাদের শিকারি প্রাণী চিনতে পারবে না এবং বনের অন্য প্রাণীর সঙ্গে কীভাবে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে হবে তা জানে না। এছাড়া বনে খাবার কীভাবে সংগ্রহ করতে হয়, সেই দক্ষতাও তাদের নেই। এর বাইরে মানুষের সংস্পর্শে থাকার কারণে তাদের শরীরে বিভিন্ন রোগ বা জীবাণু থাকতে পারে, যা বন্য প্রাণীর মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
মঙ্গাবে-কে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে খান বলেন, বন বিভাগ চাইলে বিশেষ এলাকায় জন্ম নেওয়া বাচ্চা ময়ূরটিকে পরীক্ষামূলকভাবে বনে অবমুক্ত করতে পারে। তবে আবদ্ধ পরিবেশে জন্ম নেওয়া একটি বাচ্চা, বন্য পরিবেশে টিকে থাকার সম্ভাবনা খুবই কম।
অন্য আরেক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে আইইউসিএন-এর (IUCN) বাংলাদেশ কর্মসূচি ব্যবস্থাপক এ.বি.এম সরওয়ার আলম বলেন, “ময়ূরকে স্থায়ীভাবে বনে অবমুক্ত করার আগে কর্তৃপক্ষের উচিৎ যথেষ্ট সময় নেওয়া। পুরো প্রক্রিয়াটি সুক্ষ নজরদারির মধেই করা প্রয়োজন। অভিযোজন পর্যায়ে তাদের পর্যাপ্ত সময় নিয়ে রাখতে হবে। যাতে তারা বন্য পরিবেশের সঙ্গে অভ্যস্ত হতে পারে এবং সেখানে থাকা ঝুঁকিগুলো চিনতে ও মোকাবিলা করতে শেখে।”
তিনি আরও বলেন, “অবমুক্তির পরও নিয়মিত নজরদারি ও পর্যবেক্ষণ চালিয়ে যেতে হবে। এ জন্য GPS ভিত্তিক ট্র্যাকিং প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। ময়ূরগুলো বনের পরিবেশে নিজেদের একটি পরিবার গড়ে তোলা পর্যন্ত, তাদের অবস্থান ও অবস্থা সম্পর্কে জানা যাবে এর মাধ্যমে।”
টাঙ্গাইল বন বিভাগের কর্মকর্তা আবু নাসের মোহসিন হোসেন বলেন, “এই ধরনের বন্য পরিবেশে পুনঃপ্রবর্তন (rewilding) প্রক্রিয়া নিয়ে বিশেষজ্ঞদের সব ধরনের পরামর্শকে আমরা স্বাগত জানাই। আমাদের এই উদ্যোগকে সফল করতে সহায়তা করবে এগুলো।”
ব্যানার ছবি: ভারতে পেখম মেলে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ময়ূর। ছবি: allanlau2000 via Pixabay.
সাইটেশন
Rahman, A. N., Sharif, M. A., Shuvo, K. H., Rahman, N. Z., Islam, M. T., Hoque, M. N., & Das, Z. C. (2024). Common peafowl (Pavo cristatus) farming in Bangladesh: Current status, reproductive behavior and health management. Journal of Science and Technology Research, 6(1), 21-32. doi:10.3329/jscitr.v6i1.77370
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ ২০২৬ সালে ২৬ জুন।