- বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশে বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েই চলছে। মারনঘাতি এই দুর্যোগের সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছেন কৃষকরা। বিশেষ করে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এই মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি।
- এরই মধ্যে তালগাছ রোপণ এবং বজ্রনিরোধক দন্ড (lightning arresters) স্থাপনের মতো বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। তারপরও এখন পর্যন্ত এসব প্রচেষ্টা মানুষের জীবন রক্ষায় বড় ধরনের সফলতা দেখাতে পারেনি।
- বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বজ্রবৃষ্টি ও বজ্রমেঘ সম্পর্কে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ালে, এই মৃত্যুর সংখ্যা কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরের কৃষক সুধীন চন্দ্র দাস। বাড়ি থেকে আধা মাইল দূরে তার কৃষিজমি, পরিমাণ ১৫০ শতক। পুরো জমিতেই তিনি আবাদ করেন ধান। সুধীন বলেন, এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে বোরো ধান কাটার মৌসুম। এ সময় বজ্রসহ ঝড়-বৃষ্টি খুবই সাধারণ ঘটনা। তবে ধান কাটার কাজ ফেলে রাখার সুযোগ নেই তার। পাকা ধান কাটতে বিস্তীর্ণ খোলা মাঠে যেতেই হয় তাকে। যদিও বজ্রপাত শুরু হলে আশ্রয় নেওয়ার মতো কোনো জায়গা সেখানে নেই।
“ভয় লাগে। নিজেকে কীভাবে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচিয়ে রাখবো জানি না, আর সবসময়ই মনে হয়, যেকোনো মুহূর্তে বজ্রপাতে মারা যেতে পারি,” মঙ্গাবে-কে বলেন উদ্বিগ্ন সুধীন ।
সুধীনের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার শাল্লা উপজেলায়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বজ্রপাতপ্রবণ এলাকাগুলোর একটি। ২০১৬-২০২৫, এই সময়ের বজ্রপাতের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রতি বছর প্রতি বর্গকিলোমিটারে (প্রায় ০ দশমিক ৪ বর্গমাইল) ৬৪ থেকে ৯৬টি প্রাণঘাতী বজ্রপাতের ঘটনা ঘটে।
সুধীন বলেন, তিনি এ অবস্থাতেও এখনও বেঁচে আছেন, তাই ভাগ্যবান মনে করেন নিজেকে। তবে চলতি বছর এবং আগের বছরগুলোতে সুনামগঞ্জে বজ্রপাতে মৃত্যুর অনেক খবরই তিনি দেখেছেন। এ বছরের ১৮ এপ্রিল, সারা দেশে বজ্রপাতে অন্তত ১৩ জনের মৃত্যু হয়, যার মধ্যে পাঁচজনই ছিলেন সুনামগঞ্জের।
দেশে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩০০ জন মানুষ বজ্রপাতে মারা যান। যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে। ঢাকাভিত্তিক জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি নেটওয়ার্ক ডিজাস্টার ফোরামের (Disaster Forum) সমন্বয়কারী মেহেরুননেসা জানান, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুনের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বজ্রপাতে অন্তত ২১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বজ্রপাতে প্রাণহানি কমানোর লক্ষ্যে, বিভিন্ন প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। যার মধ্যে বজ্রনিরোধক দন্ড স্থাপন, তালগাছ রোপণ এবং আগাম পূর্বাভাস ব্যবস্থার উন্নয়ন উল্লেখযোগ্য। তবুও এসব উদ্যোগ মানুষের জীবন রক্ষায় বড় ধরনের সফলতা দেখাতে পারেনি।
সাম্প্রতিক এক সংবাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে স্থাপন করা কোনো বজ্রনিরোধকই প্রাণহানি ঠেকাতে কার্যকর প্রমাণিত হয়নি।

এ বিষয়ে মঙ্গাবে কয়েকজন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলে। মৃত্যু হার বাড়ার কারণ হিসেবে, বজ্রপাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এবং বজ্রপাতপ্রবণ এলাকার বাসিন্দাদের প্রস্তুতির ঘাটতিকেই দায়ী করেছেন তারা।
অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন ইউনিভার্সিটির (Curtin University) সহযোগী অধ্যাপক আশরাফ দেওয়ান, তিনি আর্থ অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্স বিষয়ে বিশেষজ্ঞ। মঙ্গাবে-কে তিনি বলেন, “প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, জ্ঞানের ঘাটতি এবং সামগ্রিক সচেতনতার অভাবই, বাংলাদেশে বজ্রপাতজনিত মৃত্যুর জন্য দায়ী।”
২০১৯ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে বজ্রপাতজনিত মৃত্যুগুলো ঘটে সাধারণত এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে জুনের শুরু পর্যন্ত। এই গবেষণার সহ-লেখক আশরাফ দেওয়ান। গবেষণাটিতে আরও দেখা যায়, দেশের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে বজ্রপাতে মৃত্যুর সঙ্গে কৃষি সংশ্লিষ্ট কাজের সম্পর্ক রয়েছে।
দেওয়ান বলেন, “বাংলাদেশে বজ্রপাতের হার বা বজ্রপাতজনিত মৃত্যুর সংখ্যা কোনোটিই ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে না। তারপরও বজ্রপাতের ঝুঁকির মধ্যে মানুষের চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায়, বাড়ছে প্রাণহানির সংখ্যা।”
দেওয়ানের মতে, মানুষের জীবন রক্ষায় জনসচেতনতা ও শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, “১৯৭১ সালে দেশটির স্বাধীনতার পর থেকে ঘূর্ণিঝড়ের মৃত্যুর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রাণহানি নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে। এর প্রধান কারণ কার্যকর প্রস্তুতি কর্মসূচি। বজ্রপাতের ঝুঁকি মোকাবিলার ক্ষেত্রেও আমাদের একই ধরনের পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে।”

বজ্রপাতে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর উদ্যোগ কতটা কার্যকর?
বাংলাদেশের সরকারি সংবাদ সংস্থা (BSS), দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের (DDM) তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে বজ্রপাতে অন্তত ৩,৪৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
২০১৬ সালে বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে দেশটি।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের (BMD) আবহাওয়াবিদ মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক, DDM-এর পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে বজ্রপাতজনিত মৃত্যুর তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি বলেন ২০১৫ সালে বজ্রপাতে ২২৬ জন, ২০১৬ সালে ৩৯১ জন, ২০১৭ সালে ৩৮৮ জন, ২০১৮ সালে ৩৮৮ জন, ২০১৯ সালে ৩৫৯ জন, ২০২০ সালে ৪০১ জন, ২০২১ সালে ৪২৭ জন, ২০২২ সালে ৩৬৩ জন, ২০২৩ সালে ৩২২ জন, ২০২৪ সালে ২৭১ জন এবং ২০২৫ সালে ২৪৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এই বিশ্লেষণই দেখায় যে, জীবন রক্ষায় বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ কতটা ব্যর্থ হয়েছে।
২০২১-২২ সালে DDM ১৫টি ঝুঁকিপূর্ণ জেলায় প্রায় ৩০০টি বজ্রনিরোধক (Lightning arresters) দন্ড স্থাপন করে। পরে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন সরকার ওই জেলাগুলোতে আরও ৬,৭৯৩টি বজ্রনিরোধক দন্ড স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়। তবে সেটি এখনো বাস্তবায়ন হয়নি।
DDM-এর প্রশমন (Mitigation) বিভাগের উপপরিচালক রেজাউল করিম বলেন, “আসলে সরকার প্রকল্পটিকে বাস্তবসম্মত বলে মনে করেনি।” তাঁর মতে, বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে মাত্র ৩৩৬টি বজ্রনিরোধক দন্ড রয়েছে।
২০১৭ সালে বজ্রপাতে মৃত্যুহার কমানোর লক্ষ্যে সরকার দেশব্যাপী তালগাছ রোপণ কর্মসূচি শুরু করে। তবে প্রায় ৩৮ লাখ তালগাছ রোপণের পর কর্মসূচিটি বাতিল করা হয়। স্বল্পমেয়াদি সমাধান হিসেবে এটি কার্যকর বলে মনে না করায় এই সিদ্ধান্তে আসে সরকার।
তবে করিম মঙ্গাবে-কে বলেন, নতুন সরকারের সম্প্রতি চালু করা National Green Mission, কর্মসূচির আওতায় তালগাছ রোপণকে অগ্রাধিকার দেবে তাঁর বিভাগ। আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর লক্ষ্য নিয়ে এই কর্মসূচি চালু করা হচ্ছে।
২০১৮ সালে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় দেশটিতে, বজ্রপাতের আগাম সতর্কতা দিতে সক্ষম এমন আটটি সেন্সর স্থাপন করা হয়।
তবে মল্লিক বলেন, শুধু আগাম সতর্কবার্তা মানুষের জীবন রক্ষার জন্য যথেষ্ট নয়। তিনি বলেন, কোনো বজ্রপাতের ঘটনা ঘটার দুই থেকে চার ঘণ্টা আগে, BMD সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সতর্কবার্তা প্রকাশ করে। তবে “বজ্রপাতে মৃত্যুর ঘটনাগুলোই প্রমাণ করে যে, আগাম সতর্কবার্তা জানতেই পারেনা কৃষক” উল্লেখ করেন মল্লিক। এর কারণ হিসেবে তিনি বলেন, কৃষকদের বেশিরভাগের কাছেই যেমন প্রচলিত স্মার্ট ফোন থাকেনা, আবার মাঠে কাজের সময় এই বার্তা দেখার মতো সুযোগও নেই তাদের।
বজ্রপাতের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানুষ, বিশেষ করে কৃষকরা। মল্লিকের মতে বজ্রমেঘকে শনাক্ত করার উপায় সম্পর্কে জানা এবং বজ্রমেঘ দেখা দিলে সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কে সচেতনতা গড়ে তোলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সমাধানের পথ
৮ জুন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের বক্তব্যে জানান, বজ্রপাতে প্রাণহানি কমাতে তালগাছ রোপণ, কৃষকদের জন্য আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ এবং বজ্রনিরোধক দন্ড (Lightning arresters) স্থাপনের পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার।
DDM-এর কর্মকর্তাদের মতে, কৃষকদের জন্য এসব আশ্রয়কেন্দ্র প্রাথমিকভাবে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে স্থাপন করা হবে। যাতে বজ্রপাতের সময় কৃষকরা সেখানে আশ্রয় নিতে পারেন।
করিম বলেন, “এসব স্থাপনায় বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা থাকবে। পাশাপাশি এগুলো ব্যবহার করা যাবে ধান মাড়াই, স্বল্পমেয়াদি ধান সংরক্ষণ এবং বন্যাকালীন আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবেও।”
তবে সরকার কতগুলো কৃষক আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করবে, সে বিষয়ে ১৫ জুন পর্যন্ত কোনো তথ্য দিতে পারেননি দুলু। তিনি বলেন, “সরকার এখনো আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা নির্ধারণ করেনি।”
মল্লিক বলেন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করে, এ ধরনের একাধিক কৃষক আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ প্রয়োজন।
“কৃষকরা বজ্রধ্বনি শোনার পর নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছানো জন্য পর্যাপ্ত সময় পান না। তাই কাছাকাছি দূরত্বে একাধিক বহুমুখী আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা প্রয়োজন”-বলেন তিনি।
২০১৭ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, বজ্রপাতে নিহত ব্যক্তিদের অধিকাংশই কৃষিনির্ভর পরিবারের সদস্য ছিলেন। প্রাণঘাতী বজ্রপাতের সময় তাদের বেশিরভাগই বাড়ি ও কৃষিজমির মধ্যে যাতায়াত করছিলেন, অথবা বাড়ির আঙিনা ও আশপাশে চলাফেরা করছিলেন কেউ কেউ।
গবেষণাটির সহ-লেখক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মো. ফারুক হোসেন বলেন, তিনি এ ধরনের কৃষক আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণের পক্ষে।
ফারুক আরও বলেন, “ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের সচেতন করতে হবে, যাতে বজ্রপাতের সময় তারা দ্রুত কাছের আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেন। নইলে পুরো উদ্যোগই ব্যর্থ হবে।”
সুনামগঞ্জের কৃষক সুধীনের কাছে এই দুর্যোগ নিয়ে তার ভাবনা জানতে চেয়েছিলো মঙ্গাবে।
তার উত্তর ছিলো, “আমার ধানক্ষেতের কাছে উঁচু ভিত্তির ওপর একটি আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি করে দিন, যাতে বজ্রপাতের সময় আমি সেখানে আশ্রয় নিতে পারি।”
ব্যানার ছবি: মাঠ থেকে পাকা ধান কেটে নিয়ে ফিরছেন কৃষকরা। ছবি: Zaheed Sarwer Khan via Wikimedia Commons (CC BY 4.0).
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ ২০২৬ সালের ২৩ জুন।