- ভারতের অরুণাচল প্রদেশে ১,২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য, নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে বন উপদেষ্টা কমিটি।
- অতি সংকটাপন্ন ধলাপেট বকের আবাসস্থল, এই প্রকল্প এলাকা। অরুণাচলে প্রজাতিটির মাত্র ছয় থেকে নয়টি পাখি টিকে আছে বলে ধারণা করা হয়।
- তবে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটির পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনে এই পাখিটির কথা উল্লেখই করা হয়নি।
- প্রকল্পের কারণে বনভূমি নষ্টের ক্ষতিপূরণ হিসেবে, হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে মধ্যপ্রদেশে বনায়নের অনুমোদন দিয়েছে বন উপদেষ্টা কমিটি।
২০১৫ সালের এক হিসেব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে অতি সংকটাপন্ন ধলাপেট বকের সংখ্যা ৬০টিরও কম। এর মধ্যে ভারতে অরুণাচল প্রদেশে, সীমান্তবর্তী আঞ্জাও জেলায় রয়েছে ৬ থেকে ৯টির মতো বক। আর ওই এলাকাটিতেই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য ‘নীতিগত’ অনুমোদন দিয়েছে বন উপদেষ্টা কমিটি (Forest Advisory Committee-FAC)। প্রকল্পটির কারণে যে পরিমাণ বনভূমি হারিয়ে যাবে, তার ক্ষতিপূরণ হিসেবে ভারতের মধ্যপ্রদেশে প্রকল্প এলাকা থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে বনায়নের অনুমোদন দিয়েছে FAC। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধলাপেট বক সংরক্ষণের কার্যক্রমের সঙ্গে এই সিদ্ধান্ত সাংঘর্ষিক।
পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীন, আইনগত সংস্থা বন উপদেষ্টা কমিটি। গত ৮ মে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে কালাই-২ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের (Kalai II Hydroelectric Power Plant-HEP) অনুমোদন দেয় এটি। ১,২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন এই রান-অব-দ্য-রিভার বাঁধটি নির্মাণ করা হবে ব্রহ্মপুত্রের উপনদী লোহিত নদীর ওপর। এ ধরনের প্রকল্পের বৈশিষ্ট্য হলো, কোনো জলাধার তৈরি করা লাগেনা এতে। নদীর স্বাভাবিক প্রাকৃতিক প্রবাহ ও গতি ব্যবহার করে, বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হয় এ প্রক্রিয়ায়। নদীটির অববাহিকা উষ্ণমণ্ডলীয় আর্দ্র ও ঘন মিশ্র বনাঞ্চলে ঘেরা। পূর্ব হিমালয় জীববৈচিত্র্য সম্ভারের অন্তর্ভুক্ত এটি। এই এলাকায় বাঁধ নির্মাণের জন্য মোট ৩৩ হাজার ৩৩৮টি গাছ কাটার প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রকল্পের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতির তালিকায়, ধলাপেট বকের নামই নেই Environmental Impact Assessment (EIA) প্রতিবেদনে। এরপরও শর্তসাপেক্ষে প্রকল্পটির অনুমোদন দেয় কমিটি। শর্ত অনুযায়ী, ভারতের বন্যপ্রাণী ইনস্টিটিউট (Wildlife Institute of India-WII) প্রকল্পটির বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা পর্যালোচনা করবে। এছাড়া প্রকল্পের কাজ শুরু হলে ধলাপেট বকের আবাসস্থল সংরক্ষণকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে FAC। তবে সংরক্ষণ বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ভারতে ধলাপেট বকের টিকে থাকার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
পাখিটি নিয়ে গবেষণা করা প্রতিষ্ঠান Ashoka Trust for Research in Ecology and the Environment (ATREE)-এর প্রকল্প ব্যবস্থাপক ইয়ুমলাম বেঞ্জামিন বিদা বলেন, “ধলাপেট বকের মাছ ধরার জন্য স্বচ্ছ, অগভীর ও খরস্রোতা নদী প্রয়োজন। তারা মাছের জন্য লম্বা সময় ধরে অপেক্ষা করে। অন্য বকগুলোর মতো এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ানোর স্বভাব ওদের নেই। খাবার সংগ্রহের এই আচরণের কারণেই পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে সহজে মানিয়ে নিতে না পারার, আশংকা রয়েছে প্রজাতিটির।”
তিনি আরও বলেন, “মাছই তাদের একমাত্র খাদ্য। নদীতে কোনো ধরনের পরিবর্তন হলে তাদের খাদ্যাভ্যাসের ওপর প্রভাব পড়বে। এছাড়া কমে আসবে শিকারের প্রয়োজনীয় শক্তি।”

পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন
ধলাপেট বক বন্যপ্রাণী সুরক্ষা আইন-এর প্রথম তফসিলে তালিকাভুক্ত। ফলে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ সুরক্ষা পেয়ে থাকে এ প্রজাতিটি। যদিও অতীতেও এ পাখির সংখ্যা ছিলো হাতে গোনা। তবে গত কয়েক দশকে এর বিস্তার ও সংখ্যা দ্রুত কমে গেছে।
বিশ শতকের শুরুতে নেপাল, সিকিম, অরুণাচল প্রদেশ, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে দেখা মিলতো এই পাখির। বর্তমানে যেসব জায়গায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের প্রভাব তুলনামূলক কম, এমন সব এলাকা যেমন-অরুণাচল প্রদেশ, মিয়ানমার ও ভুটানের কিছু এলাকায় এই বকটি টিকে আছে। বেঞ্জামিন বিদা বলেন, “ধলাপেট বক পাখি যেখানে পাওয়া যায়, ধরে নেয়া হয় সেখারকার প্রাকৃতিক পরিবেশ এখনো নির্মল এবং বিশুদ্ধ।” অথচ কালাই-২ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের EIA প্রতিবেদনে এই পাখির কোনো উল্লেখই নেই।
প্রকল্পটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে রাজ্য সরকার ও THDC Limited। আর জলশক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান WAPCOS প্রকল্পটির EIA প্রতিবেদন তৈরি করেছে। FAC-এর বৈঠকের কার্যবিবরণীতে সরকারি কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্প এলাকায় ধলাপেট বকের উপস্থিতির কোনো তথ্য নথিভুক্ত না হওয়ায়, EIA প্রতিবেদনে এ প্রজাতির কথা উল্লেখ করা হয়নি। তবে সংরক্ষণবিদরা লোহিত নদীর উজানে, প্রকল্প এলাকা থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের ওয়ালং এলাকায় ধলাপেট বকের উপস্থিতির তথ্য পেয়েছেন।
প্রস্তাবিত বাঁধটি নির্মাণ করা হবে হাওয়াই এলাকায়। এটি নামদাফা টাইগার রিজার্ভ থেকে প্রায় ২৭ কিলোমিটার এবং কামলাং বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য থেকে ১১ কিলোমিটার দূরে।
ধলাপেট বক ছাড়াও, প্রকল্পের কারণে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশংকা রয়েছে। এর মধ্যে এ অঞ্চলের স্থানীয় তৃণভোজী প্রাণী টাকিন, ভারতীয় সিভেট, আসামের বানর এবং বনবিড়াল অন্যতম। EIA প্রতিবেদনে বলা হয়, টাকিন সংরক্ষণের জন্য ১ কোটি রুপি ব্যয়ে একটি সংরক্ষণ পরিকল্পনা প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আওতায় থাকবে আবাসস্থল সংরক্ষণ, চোরাশিকার প্রতিরোধ, পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা, এবং প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম।
Indian Institute of Science এর Centre for Ecological Sciences বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক উমেশ শ্রীনিবাসন বলেন, অরুণাচল প্রদেশের স্থানীয় প্রজাতিগুলোর ওপর প্রকল্পটির সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাবই প্রমাণ করে, সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি অঞ্চলে ক্ষতিপূরণমূলক বনায়ন করার সিদ্ধান্ত কতটা অকার্যকর।
“উদাহরণ হিসেবে ধলাপেট বকের কথা বলা যায়। এই পাখির জন্য দ্রুত প্রবাহমান নদী ও বনভূমি প্রয়োজন। তবে মধ্যপ্রদেশ এই প্রজাতির প্রাকৃতিক আবাসস্থলের উপযুক্ত নয়।”
মধ্যপ্রদেশের গুনা জেলার ৫১টি ধংস হওয়া বনভূমিতে THDC Limited-কে ক্ষতিপূরণমূলক বনায়নের নির্দেশ দিয়েছে FAC। সাধারণত শুষ্ক ও পাতাঝড়া বৈশিষ্ট্যৈর এসব বনভূমি।
শ্রীনিবাসন বলেন, “স্থানীয় প্রজাতির গাছ ব্যবহার করে বৈজ্ঞানিকভাবে বনায়ন করা হলেও, সেখানে মধ্যপ্রদেশের নিজস্ব জীববৈচিত্র্যই ফিরে আসবে, অরুণাচল প্রদেশের নয়। অথচ অরুণাচল বিশ্বের অন্যতম জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ অঞ্চল।

স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর প্রকল্পের প্রভাব
ধারণা করা হচ্ছে, কালাই-২ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে প্রায় ৩৩টি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের সমর্থনে, এগুচ্ছে প্রকল্পটি। এজন্য কেন্দ্র সরকার এক হাজার কোটিরো বেশি রুপি আর্থিক সহায়তা দিয়েছে অরুণাচল প্রদেশ সরকারকে।
কেন্দ্রীয় সরকারের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রকল্পের মাধ্যমে অরুণাচল প্রদেশের নামসাই ও আঞ্জাও জেলায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ২৯ কিলোমিটার সড়ক ও সেতু নির্মাণ। যার বেশির ভাগই স্থানীদের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় জনগণ বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিপূরণ, কর্মসংস্থান এবং করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) কার্যক্রমের সুবিধা পাবে।
তবে প্রকল্পটি নিয়ে স্থানীয় জনগণের মধ্যে মত পার্থক্য রয়েছে। কেউ এটিকে স্বাগত জানাচ্ছেন, অনেকে আবার এই কাজের পুরোপুরি বিরোধিতা করছেন। নুকুং গ্রামের বাসিন্দা এবং জেলা কংগ্রেস কমিটির সভাপতি রোশমান তাওসিক বলেন, এই প্রকল্পের কারণে তাদের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। এই আশংকা থেকে এই প্রকল্পের বিরোধিতা করছে তাদের সম্প্রদায়। এরই প্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে WAPCOS-কে তিনি একটি আইনি নোটিশ পাঠান। সেখানে তাওসিক অভিযোগ করেন, EIA প্রতিবেদনের কিছু অংশ আগের একটি সংস্করণ থেকে হুবহু নকল করা হয়েছে। তিনি বলেন, “২০০৮ সালে প্রকল্পটি প্রস্তাব হওয়ার পর থেকেই আমরা এর বিরোধিতা করে আসছি। আমাদের জমি হারাতে চাই না আমরা, আর সেগুলো পানির নিচে তলিয়ে যেতেও দেখতে চাই না।”
প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আগে স্থানীয়দের মতামত নিতে, ২০২৫ সালের ২০ আগস্ট গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে স্থানীয় সম্প্রদায়ের নেতারা, উদ্ভিদ ও প্রাণিবৈচিত্র্য নিয়ে WAPCOS-এর করা জরিপের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। পাশাপাশি শব্দ ও পানি দূষণ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তারা। EIA প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রকল্প এলাকা থেকে ১০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে, ২০৯টি উদ্ভিদ প্রজাতি এবং ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী শনাক্ত করা হয়।
এর জবাবে WAPCOS জানায়, মিশমি তিতার মতো স্থানীয় ওষধি গাছও প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পানি দূষণের আশংকার বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি জানায়- কর্মশালা, পার্কিং এলাকা ও অন্যান্য উৎস থেকে নির্গত বর্জ্য শোধনের জন্য একটি তেল ও গ্রিজ পৃথকীকরণ ইউনিট স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে প্রতিবেদনে।এছাড়া বর্জ্য পরিবেশে ছাড়ার আগে তা শোধন করা হবে, যাতে জলজ প্রতিবেশের ওপর কোনো প্রভাব না পড়ে।
ব্যানার ইমেজ: অরুণাচল প্রদেশের নামদাফায় বিচরনরত ধলাপেট বক। ছবি: Rajkumar99 via Wikimedia Commons (CC BY-SA 4.0).
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে ইন্ডিয়া-তে ২০২৬ সালের ১৯ জুন।