- বাংলাদেশে মিঠা পানির মাছের অন্যতম উৎস কাপ্তাই হ্রদ। চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের ২৭ হাজারের বেশি নিবন্ধিত জেলের জীবিকা নির্ভর করে এই হ্রদের ওপর।
- তবে গত কয়েক বছরে আশংকাজনক হারে কমেছে, লাভজনক কার্প জাতীয় মাছ আহরণ। ফলে প্রান্তিক জেলেদের অনেকেই বাধ্য হচ্ছেন বংশপরম্পরায় চলে আসা পেশা ছেড়ে দিতে। আবার কেউ খুঁজছেন বিকল্প কাজ।
- গবেষকদের মতে, কার্প জাতীয় মাছের জন্য উপযুক্ত প্রজননক্ষেত্রসহ বিশেষ ধরনের পরিবেশ প্রয়োজন। তবে এই হ্রদের প্রধান প্রজননক্ষেত্রগুলোর অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। এর সঙ্গে অতিরিক্ত মাছ আহরণও কমিয়ে দিচ্ছে, প্রাকৃতিকভাবে মাছের পরিমাণ বেড়ে ওঠার সুযোগ।
- বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, প্রজননক্ষেত্র পুনরুদ্ধার, কার্প মাছের পোনা অবমুক্তি বাড়ানো এবং মৎস্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন না হলে এই সংকট আরও গভীর হবে। এছাড়া ক্ষুদ্র জেলেদের জীবিকা ও আয়ের ওপর পড়বে সবচেয়ে বড় প্রভাব।
খোকন জলদাস, বয়স ৫৩, পেশা মাছ ধরা। চুপচাপ বসেছিলেন বাড়ির উঠানে। বাড়ির ঠিক পাশেই কাপ্তাই লেক, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কৃত্রিম হ্রদও এটি। সেখানে নোঙর করা কয়েকটি মাছ ধরার নৌকা। খোকনের দৃষ্টিতে হতাশা কিংবা দুঃচিন্তা। নীরবে হ্রদের দিকেই তাকিয়ে ছিলেন তিনি।
কয়েক বছর আগেও ওই নৌকাগুলোর একটি ছিলো তার ঠিকানা। এতে বসেই দিনের পর দিন হ্রদে জাল ফেলে মাছ ধরতেন। সেই মাছ বিক্রি করেই চলত পরিবারের খরচ। তবে এখন শুধু মাছ ধরে সংসার চালানো আর সম্ভব হচ্ছে না। তাই বেছে নিয়েছেন অন্য আর একটি পেশা। আয় বাড়াতে নৌকা নির্মাণ শিল্পে দিনমজুরের কাজ করছেন তিনি। টুকটাক সুযোগ পেলে মাছ ধরতেও নামেন খোকন।
রাঙামাটি জেলার সদর উপজেলার কাপ্তাই হ্রদের তীরবর্তী পুরাতন জেলেপাড়া গ্রামের বাসিন্দা খোকন বলেন, “আগে হ্রদে প্রচুর কার্প জাতীয় মাছ পাওয়া যেত। সহজেই ধরতে পারতাম মাছ। দিনে আয় হতো ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত। তবে এখন বেশি দামের কার্প জাতীয় মাছের পরিমাণ একদম কমে গেছে।”
খোকন বলেন, “এমনও দিন গেছে যখন হ্রদে গিয়ে একটাও মাছ না পেয়ে খালি হাতে ফিরে এসেছি। তাই অন্য কাজ না করলে, ছয় জনের সংসার চালানো খুব কঠিন।” কাপ্তাই হ্রদের তীরজুড়ে এখন ঘরে ঘরে খোকনের গল্প।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কার্প জাতীয় মাছ শিকার করেই সংসার চালিয়েছেন তারা। তবে ক্রমশ এই মাছ দুস্প্রাপ্য হয়ে পড়ায়, বাধ্য হয়ে অনেক জেলে ছেড়ে দিচ্ছেন পূর্বপুরুষের এই পেশা।

বিপাকে জেলেরা
রাঙামাটির মৎস অবতরণ কেন্দ্রে সকাল থেকেই, নৌকা থেকে নামানো হচ্ছে ঝুড়ি ভর্তি কাচকি (Corica soborna) ও চাপিলা (Gudusia chapra) মাছ। এক সময় কাপ্তাই হ্রদ বড় কার্প জাতীয় মাছের জন্যই প্রসিদ্ধ ছিলো। এর মধ্যে রুই (Labeo rohita), কাতলা (Catla catla) ও মৃগেল (Cirrhinus mrigala) এখন দেখা যায় কম। অবতরণকেন্দ্র থেকে মাছ বাছাই করে দেশের বিভিন্ন বাজারে, বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রামে, পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করে মাছ ব্যবসায়ীরা।
কাপ্তাই লেক ফিশারিজ সোসাইটি লিমিটেডের পরিচালক সুকান্ত দাস বলেন, “কয়েক বছর আগেও কার্প জাতীয় মাছই বেশি দেখা যেতো। এখন যা আসে, তার বেশির ভাগই ছোট মাছ।”
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, কাপ্তাই হ্রদে স্থানীয় কার্প জাতীয় মাছ যার মধ্যে রুই, কাতলা, মৃগেল এবং কালিবাউস এর আহরণ পর্যায়ক্রমে কমছে। ২০০১-০২ অর্থবছরের ৪২২ টন থেকে কমে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মাত্র ২২ টনে নেমে এসেছে আহরণের পরিমাণ।
তবে একই সময়ে হ্রদে মোট মাছের উৎপাদন চিত্র ঠিক উল্টো। ২০০১-০২ অর্থবছরে ৭ হাজার ২৪৭ টন থেকে বেড়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে ২০ হাজার ৬৩১ টনে।
জেলে ও মাছ ব্যবসায়ীরা বলছেন, মাছের মোট উৎপাদন বাড়লেও তাদের কমে গেছে আয়।
সুকান্ত দাস বলেন, “ উৎপাদন বৃদ্ধির বেশির ভাগই এসেছে কম দামের ছোট মাছ থেকে। আগে কয়েক ঝুড়ি কার্প মাছ বিক্রি করেই যে আয় হতো, এখন তার জন্য অনেক বেশি ছোট মাছ ধরতে হয়। তাই মাছের পরিমাণ বাড়লেও, বাড়েনি আয়। এই পরিবর্তন জেলে ও ব্যবসায়ী দুই পক্ষকেই আর্থিকভাবে ক্ষতির মুখে ফেলেছে।”

প্রতিবেশ নষ্ট হওয়ায় কমেছে কার্পের প্রজনন
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মিঠা পানির উৎস থেকে মোট ১৪ লাখ ৩৬ হাজার ৭০ টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে উৎপাদনের প্রায় ১ দশমিক ৪৪ শতাংশই এই হ্রদ থেকে এসেছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ শহিদুল আলম বলেন, “কাপ্তাই হ্রদের মাছ, কৃত্রিমভাবে চাষ করা মাছের মতো ছোট জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে না। তারা মুক্তভাবে বিচরণ করে, খাদ্য সংগ্রহ করে প্রাকৃতিকভাবে এবং একটি জটিল প্রতিবেশের মধ্যে বেড়ে ওঠে।”
তিনি বলেন, “ উপযুক্ত প্রতিবেশের প্রতিফলন মাছের স্বাদেও পাওয়া যায়। অনন্য স্বাদের কারণে ক্রেতাদের কাছেও এগুলো সমাদৃত। পুষ্টি গুণের দিক থেকেও এসব মাছ উচ্চমানের প্রোটিনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। এ কারণেই কার্প মাছের আহরণ কমে গেলেও কাপ্তাই হ্রদের মাছের চাহিদা এখনো রয়েছে।”
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (BFRI) রাঙামাটি কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ইশতিয়াক হায়দার বলেন, “বর্ষার স্বাভাবিক পানি প্রবাহ এবং অনুকূল জলজ পরিবেশ কার্পজাতীয় মাছের প্রজননের জন্য উপযুক্ত ক্ষেত্র। তবে কাপ্তাই হ্রদে এখন এসবের বেশির ভাগই অনুপস্থিত। পলি জমে হ্রদের চারটি প্রধান প্রজনন ক্ষেত্র নষ্ট হয়ে গেছে। এর সঙ্গে অতিরিক্ত মাছ আহরণও প্রাকৃতিকভাবে কার্প মাছের পরিমাণ পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা কমিয়ে দিয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “ছোট মাছ তুলনামূলক দ্রুত বংশবিস্তার করে। প্রজননের জন্য তাদের কার্প জাতীয় মাছের মতো বিশেষ পরিবেশেরও প্রয়োজন হয় না। পরিবর্তিত পরিবেশের সঙ্গে সহজেই মানিয়ে নিতে পারে তারা। এ কারণেই ছোট মাছ বাড়ছে।”

টিকে থাকার লড়াই
২০২৪ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী, প্রায় ৬৮ হাজার ৮০০ হেক্টর (১ লাখ ৭০ হাজার একর) আয়তনের কাপ্তাই হ্রদে মূলত মাঝারি ও প্রান্তিক পর্যায়ের জেলেদেরই জীবিকা নির্ভরশীল।
জাতীয় জেলে সমিতির তথ্য অনুযায়ী, কাপ্তাই হ্রদে মাছ ধরার জন্য নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ২৭ হাজার।
আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, এই হ্রদে জেলেরা তিন ধরনের নৌকা এবং ১৬ ধরনের জাল ব্যবহার করেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় ভাসা জাল (বড় ফাঁসের গিলনেট) এবং কাচকি জাল (সুক্ষ ফাঁসের সেইন জাল)।
ভাসা জাল একটি নির্দিষ্ট স্থানে পেতে রাখা হয়। পানির স্রোতে চলাচলের সময় মাছ সেই জালে আটকা পড়ে। অন্যদিকে কাচকি জাল হ্রদের একটি নির্দিষ্ট অংশ জুড়ে টেনে নেওয়া হয়। পথে যা মাছ পড়ে, সবই ধরা পড়ে এতে।
জেলেদের ভাষ্য মতে, ছোট মাছের আহরণ বাড়ায় এখন কাচকি জাল ব্যবহার হয় বেশি। তবে এই জাল কেনার সামর্থ্য বেশির ভাগ প্রান্তিক জেলের নেই।
আকারভেদে একটি কাচকি জালের দাম ২ থেকে ৬ লাখ টাকা। সেখানে একটি ভাসা জালের দাম ২০ থেকে ৬০ হাজার।
অন্যদিকে, যেসব জেলে বেশি দামের কাচকি জালে বিনিয়োগ করতে পারছেন, তারা লাভবান হচ্ছেন। কারণ এই জাল দিয়ে প্রায় সব ধরনের মাছই ধরা সম্ভব। ফলে কাপ্তাই হ্রদে জেলে ও বড় বিনিয়োগকারী মৎস্য আহরণকারীদের মধ্যে বৈষম্য ক্রমশ বাড়ছে।

জাতীয় জেলে সমিতির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কাপ্তাই হ্রদে এক হাজারেরও বেশি কাচকি জাল ব্যবহারহচ্ছে। নিবন্ধিত জেলেদের অনেকেই এখন বড় মৎস্য আহরণকারীদের নৌকায় কাজ করছেন মজুর হিসেবে। কারণ, ভাসা জাল দিয়ে তারা যা মাছ ধরেন, তাতে আর পরিবারের খরচ চলেনা।
রাঙামাটি জেলা জাতীয় জেলে সমিতির সভাপতি ইমাম হোসেন বলেন, “মাছ কোথায় আছে, আমরা জানি। অথচ সেগুলো ধরার জন্য কাচকি জাল কেনার সামর্থ্য আমাদের নেই।”
ইশতিয়াক হায়দার বলেন, “প্রজনন ক্ষেত্র পুনরুদ্ধার, কার্প মাছের পোনা অবমুক্তি বৃদ্ধি এবং ক্ষতিকর মাছ ধরার পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কাপ্তাই হ্রদে কার্প জাতীয় মাছের পরিমাণ বাড়ানোর সম্ভাবনা খুবই কম।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, “কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হলেও অল্প সময়ের ভেতর কাপ্তাই হ্রদে কার্প মাছের উপস্থিতি আগের অবস্থায় ফিরতে সময় লাগবে।”
কর্ণফুলী নদীর ওপর ১৯৬০ সালে নির্মাণ করা হয় জলবিদ্যুৎ বাঁধ। কাপ্তাই লেকের সৃষ্টি সেখান থেকেই।
ব্যানার ছবি: কাপ্তাই হ্রদে মাছ ধরছেন জেলেরা। ছবি: Alex Treadway/ICIMOD, Flickr (CC BY-NC-ND 4.0)।
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ ২০২৬ সালের ৩ জুলাই।
সাইটেশন:
Lima, R. A., Ali, A., Rahman, M. K., Islam, M. S., Moniruzzaman, M. & Tamanna, T. A. (2023). An overview on hydro-biology and management of Kaptai Lake Fisheries, Bangladesh. International Journal of Aquaculture and Fishery Sciences, 9(3), 029-039. doi:10.17352/2455-8400.000089
Rahman, B. M., S., Rahman, M. K., Ali, A., Lima, R. A., Mia, M. L. & Mahmud, Y. (2024). Catch composition, catch per unit effort (CPUE) and species selectivity of fishing gears on multi-species Kaptai Lake in Bangladesh. Heliyon. 10(10). doi:S2405-8440(24)07204-9