- ভারতের আসামের কয়েকটি জেলায়, ভূগর্ভস্থ পানিতে পাওয়া গেছে অনিরাপদ মাত্রার ফ্লুরাইড। দীর্ঘদিন ধরে এই পানি পান করার ফলে, দেখা দিচ্ছে দাঁত ও হাড়জনিত ফ্লুরোসিসের নিরাময় অযোগ্য (irreversible) সমস্যা।
- ফ্লুরাইট সমৃদ্ধ শিলা থেকে ফ্লুরাইড ভূগর্ভস্থ পানিতে প্রবেশ করে। এখন পর্যন্ত পুকুর ও ঝর্নার মতো মাটির উপরিভাগের পানির উৎসগুলোকে নিরাপদ বলে বিবেচনা করা হয়।
- জল জীবন মিশন (Jal Jeevan Mission) রাজ্য জুড়ে ফ্লুরাইডে আক্রান্ত গ্রামগুলোতে, জলাশয় থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহের কাজ করছে।
তাপাতজুরি গ্রামের ২১ বছরের আমজাদ হোসেন। তার বাসা থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরত্বে থাকেন প্রতিবেশী দেলোয়ার হোসেন। আয়-রোজগারের জন্য প্রতিদিনই তাকে যেতে হয় হোসেনের বাড়িতে। সেখানে বোনেন আগর গাছের পাটি। তবে এখন বিষয়টি তাদের কাছে অলৌকিক। কারণ কয়েক বছর আগেও আমজাদ লাঠি ছাড়া এক পা-ও হাঁটতে পারতেন না।
আমজাদের মা হালিমা খাতুন বলেন, “আমার তিন ছেলেরই শরীরে বিকৃতি দেখা দিয়েছিলো। পরে আমরা জানতে পারি, যে পানি পান করি সেটির কারণে এই বিকৃতি”। তার ছেলেদের মধ্যে হাড়জনিত ফ্লুরোসিসের (skeletal fluorosis) লক্ষণ দেখা দিয়েছিল, যা অতিরিক্ত ফ্লুরাইডযুক্ত পানি পান করার কারণে হয়। তবে তার মেয়ে এই রোগ থেকে রক্ষা পেয়েছে।
নগাঁও জেলার কামপুর শহরের সমাজকর্মী ধরনী শাইকিয়া, দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করছেন আসামে। বিশেষ করে নগাঁও, হোজাই ও কারবি আংলং জেলায় ফ্লুরোসিসের ঘটনার প্রমাণ সংগ্রহ করে আসছেন ৬২ বছর বয়সী এর নারী। তিনি বলেন, ২০২০ সাল পর্যন্ত ১৩টি জেলায় এ সমস্যা দেখা দিয়েছে। ২০২২ সালে ভারতের জলশক্তি মন্ত্রণালয়, আসামে নয়টি জেলায় নিরাপদ মাত্রার চেয়ে বেশি ফ্লুরাইড দূষণের বিষয়টি নিশ্চিত করে। তবে ২০১৭-১৮ সালে জরিপ পরিচালনার পর থেকে, প্রায় এক দশক ধরে ভূগর্ভস্থ পানিতে দূষণের মাত্রা, আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ও উপসর্গ সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো সরকারি তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এদিকে রাজ্য জুড়ে ফ্লুরোসিসের প্রকোপ গ্রাস করে চলেছে মানুষের জীবন।
যেভাবে ফ্লুরাইড প্রবেশ করে আসামের পানিতে
রাজ্যের ভূগর্ভস্থ পানিতে ফ্লুরাইড দূষণ প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৯৯ সালে। কারবি আংলংয়ে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ (PHED)-এর প্রকৌশলী এ. বি. পল এটি শনাক্ত করেন।
রাজ্য জুড়ে ফ্লুরাইড দূষণ নিয়ে গবেষণা করা PHD গবেষক নিকিতা নিয়োগ বলেন, মূলত ভূতাত্ত্বিক (geogenic) কারণে ফ্লুরাইডের দূষণ হয়। “আসাম অঞ্চলটি শিলং মালভূমির একটি সম্প্রসারিত অংশ, যেখানে ফ্লুরাইটের মতো খনিজে সমৃদ্ধ প্রাক-ক্যামব্রিয়ান (Precambrian) যুগের শিলা রয়েছে। এসব শিলা থেকে ফ্লুরাইড ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশে যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, পানীয় জলে ফ্লুরাইডের নিরাপদ মাত্রা প্রতি লিটারে ১ দশমিক ৫ মিলিগ্রাম। এর চেয়ে বেশি মাত্রা হলে তা পান করার জন্য নিরাপদ নয়,” জানান নিয়োগ। ২০২১ সালে একটি গবেষণা প্রকাশ হয় বিষয়টি নিয়ে। যেখানে নিয়োগ ছিলেন সহ-লেখক। গবেষণার অংশ হিসেবে নগাঁও, কামপুর মেট্রোপলিটন ও পশ্চিম কারবি আংলং জেলার ভূগর্ভস্থ পানির নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এতে নগাঁওয়ের একটি নমুনায় প্রতি লিটার পানিতে সর্বোচ্চ ৯ মিলিগ্রাম ফ্লুরাইড পাওয়া যায়।
শাইকিয়ার তথ্য অনুযায়ী, তাপাতজুরি গ্রামে এক হাজারের বেশি শিশু ফ্লুরোসিসে আক্রান্ত। তিনি বলেন, “বিনাকান্দিতে ৪৮৫টি গ্রাম রয়েছে, যেখানে অধিকাংশ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে, যা আসামের সবচেয়ে বেশি ফ্লুরাইড-আক্রান্ত অঞ্চলগুলোর একটি।”
তাপাতজুরি বড়হামপুর (Barhampur) বিধানসভা আসনের অন্তর্ভুক্ত। স্থানীয় বিধায়ক এবং ভারতীয় জনতা পার্টির (Bharatiya Janata Party) নেতা জিতু গোস্বামী বলেন, “দোবকা ও কথিয়াতলির মতো অনেক জায়গায় ফ্লুরাইডের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমি পানি সরবরাহ বিভাগকে চিঠিও দিয়েছি। পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করছি, যাতে তারা ভূগর্ভস্থ পানির উৎস এড়িয়ে চলে এবং নদী ও ঝর্নার পানি বেশি ব্যবহার করে।”
তবে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে বিভাগের সঙ্গে গোস্বামীর আলোচনা আর এগোয়নি।
আসামের ক্ষেত্রে, প্রাকৃতিক বা ভূতাত্ত্বিক (geogenic) কারণে সৃষ্ট ফ্লুরাইড দূষণ মূলত ভূগর্ভস্থ পানিকে দূষিত করছে। ফলে নদী, পুকুর ও ঝর্নার মতো উপরিভাগের পানির উৎসগুলো সাধারণত অপেক্ষকৃত নিরাপদ।

মানুষের শরীরে ফ্লুরোসিসের প্রভাব
শাইকিয়া লক্ষ্য করেন, সাধারণত ফ্লুরাইডযুক্ত পানি পান করার উপসর্গগুলো দেখা দেয় কয়েক বছর পর। তিনি জানান, খনিজ সম্পূরক ওষুধ (mineral supplements) অনেক ফ্লুরোসিসে আক্রান্ত শিশুর অবস্থার উন্নতিতে সহায্য করেছে। ২০১১ সালে ডেন্টাল ফ্লুরোসিসে আক্রান্ত হয়েছিল শাইকিয়ার ছেলেও। আর খনিজ সম্পূরক ওষুধে সেরে ওঠে তার বাচ্চাটি।
গুয়াহাটি মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের কমিউনিটি মেডিসিন বিভাগের প্রধান জুতিকা ওঝা বলেন, শিশুদের ক্ষেত্রে খনিজ গ্রহণ ফ্লুরোসিস নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে, তবে এর কোনো চিকিৎসা নেই।
প্রতি লিটারে ০ দশমিক ৫ থেকে ১ মিলিগ্রাম মাত্রায় ফ্লুরাইড দাঁতের এনামেলকে শক্তিশালী করে দাঁতের ক্ষয় প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে। তবে এর চেয়ে বেশি মাত্রা দাঁতের জন্য ক্ষতিকর। ওঝা বলেন, “অতিরিক্ত ফ্লুরাইড মানুষের শরীরে তিন ভাবে প্রভাব ফেলে- প্রথমত ডেন্টাল ফ্লুরোসিস, যার লক্ষণ হলো দাঁতের রং পরিবর্তন, ছোপ ছোপ দাগ এবং ক্ষুদ্র গর্ত তৈরি হওয়া; দ্বিতীয়ত হাড়জনিত ফ্লুরোসিস, এর লক্ষণ অস্থি সন্ধিতে ব্যথা, শরীর শক্ত হয়ে যাওয়া এবং শারীরিক বিকৃতি; এবং তৃতীয় প্রভাব হলো পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা ও পেশির দুর্বলতা।”
তিনি বলেন, “এটি নিয়ন্ত্রণ করতে হলে ফ্লুরাইডের সংস্পর্শ থেকে শরীরকে দুরে রাখতে হবে এবং একই সঙ্গে নিতে হবে সহায়ক চিকিৎসা।” তিনি আরও জানান, উচ্চ ফ্লুরাইডপ্রবণ এলাকায় প্রতি মাসে প্রায় ১০ থেকে ৩০টি ঘটনা শনাক্ত হয়।
কথিয়াতলি ব্লক পাবলিক হেলথ সেন্টারের ডেন্টাল সার্জন অনুজ কুমার বরাহ বলেন, “প্রতি মাসে ডেন্টাল ফ্লুরোসিসের উপসর্গ নিয়ে পাঁচ থেকে ছয়জন রোগী আমার কাছে আসে। তবে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি।”
যদিও শিশুদের ক্ষেত্রে ফ্লুরোসিসের উপসর্গ কখনও কখনও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, তবে কিছু মানুষকে সারাজীবন এই রোগ নিয়েই বেঁচে থাকতে হয়।
আমজাদ হোসেনের বাড়ি থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে থাকেন ৫০ বছর বয়সী সাধনী কলিতা। তিনি বলেন, “আমার শরীরে সবসময় ব্যথা থাকে, পা ফুলে যায়। আমার জ্বর, উচ্চ রক্তচাপ ও ডায়াবেটিসও আছে, এজন্য আমাকে নিয়মিত ওষুধও খেতে হয়।”

ফ্লুরাইডমুক্ত পানির প্রত্যাশা
২০১৯ সালে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগ (PHED) গ্রামীণ এলাকায় জল জীবন মিশন (JJM) নামে একটি প্রকল্প চালু করে। মূলত বাঁধ, ঝর্না ও হ্রদ থেকে সংগ্রহ করা পানি পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্রামবাসীকে সরবরাহ করতেই এই উদ্যোগ। তাদের তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রকল্প নেয়া হয় নগাঁও জেলায়। মোট ৯১৪টি প্রকল্পের মধ্যে মাত্র ৫১০টি, অর্থাৎ প্রায় ৫৫ শতাংশ কার্যকর সেখানে।
ওয়াটার স্যানিটেশন সাপোর্ট অর্গানাইজেশনের (Water Sanitation Support Organisation) সহকারী প্রকৌশলী ভূপেন বর্মণের তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণ এলাকায় ৮৩টি পানি পরীক্ষাগারও স্থাপন করা হয়েছে প্রকল্পের আওতায়।
সাম্প্রতিক পরীক্ষায় জল জীবন মিশন প্রকল্পের আওতায় স্থাপিত কলের পানির নমুনায় কোনো ফ্লুরাইড পাওয়া যায়নি বলে জানান বর্মন। তিনি বলেন, পরীক্ষার পর জেলায় এই প্রকল্পের আওতায় সরবরাহ করা পানি নিরাপদ বলে প্রমাণিত। তবে অন্যান্য ভূগর্ভস্থ পানির উৎসে ফ্লুরাইড থাকতে পারে।

সংকট মোকাবিলায় উদ্যোগ ও বাস্তব পরিস্থিতি
PHED-এর তথ্য অনুযায়ী, রাজ্যের ৮৩ শতাংশ গ্রামীণ এলাকা জল জীবন মিশন (JJM) প্রকল্পের আওতায় এসেছে। তবে পরিচালনাগত প্রতিবন্ধকতার কারণে নিয়মিতভাবে এই পানি পাওয়ার সুযোগ সীমিত।
নগাঁও জেলার দিখারুমুখ গ্রামে বং রংপি একজন জল মিত্র (JJM-এর আওতায় পাইপলাইনের পানি সরবরাহ ব্যবস্থা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মী) হিসেবে কাজ করেন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে চারটি ফ্লুরাইড-আক্রান্ত গ্রামে পাইপলাইনের পানি সরবরাহ করা হয়। রংপি বলেন, “এই পানির উৎস তিন কিলোমিটার দূরে উদারজুরি ঝর্না। আমরা সেখান থেকে পানি এনে ৫০ হাজার লিটারের একটি ট্যাংকে সংরক্ষণ করি।”
তবে এই প্রক্রিয়ায় উচ্চ ভোল্টেজের বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয়। ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে এই প্রক্রিয়ায় সরবরাহ ব্যাহত হয় । তিনি বলেন, “গ্রীষ্ম ও বর্ষাকালে কখনও কখনও টানা এক থেকে দুই দিন পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। এ সময় গ্রামের মানুষকে আবারও ভূগর্ভস্থ পানির উৎসে ফিরে যেতে হয়।” এমন পরিস্থিতিতে ফ্লুরাইডযুক্ত পানির ঝুঁকির মুখে পড়ে এলাকাবাসী।

ফ্লুরাইড অপসারণে পরীক্ষামূলক উদ্যোগ
তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের রবিন কুমার দত্তের নেতৃত্বাধীন একটি গবেষক দল, পানীয় জল থেকে অতিরিক্ত ফ্লুরাইড অপসারণের একটি প্রযুক্তি তৈরি করেছে। নির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এটি করতে সক্ষম বলে জানান তারা । এই প্রযুক্তিকে বড় পরিসরে সম্প্রসারণ এবং আসামে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। বর্তমানে নেদারল্যান্ডসভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ZOA-এর সহায়তায় ইয়েমেনের কয়েকটি এলাকায় এই প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক প্রয়োগ চলছে।
এর আগে , রসায়ন বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক দত্ত পানি থেকে আর্সেনিক ও লোহা অপসারণের প্রযুক্তিও উদ্ভাবন করেন।
ব্যানার ছবি: ফ্লুরোসিসে আক্রান্ত একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন ধরনী শাইকিয়া। ছবি: নবারুণ গুহ।
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে ইন্ডিয়া-তে ২০২৬ সালের ১৬ জুন।