- সারাদেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা করেছে বাংলাদেশ সরকার। আগামী পাঁচ বছরে পর্যায়ক্রমে রোপণ করা এসব গাছ। ম্যানগ্রোভ বন, পাহাড়ি বন, সড়ক ও নদীর তীর, এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সব সরকারি প্রতিষ্ঠানকে এই বনায়নের আওতায় আনা হবে।
- উদ্যোগটি বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া অঙ্গীকারের অংশ। এর লক্ষ্য, সারাদেশে একটি সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলে বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ বাড়ানো।
- তবে উদ্যোগটি নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সংরক্ষণবিদরা। তাদের অনেকেরই আশংকা, পরিকল্পনাটি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন না হলে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার পরিবর্তে, হতে পারে অর্থ ও সম্পদের অপচয় ।
- তাঁদের পরামর্শ, পরিকল্পনা প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপেই সতর্ক থাকতে হবে, যাতে উদ্যোগটি থেকে সর্বোচ্চ সুফল পাওয়া যায়।
বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সবুজের আচ্ছাদন বাড়াতে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। আগামী পাঁচ বছর সারা দেশে এই কার্যক্রম চলবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, “বর্তমানে কৃষি মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার সঙ্গে আমরা সমন্বয় করছি। কোন সংস্থা কতটি চারা রোপণ করবে, তা চূড়ান্ত করার কাজ চলছে।”
তিনি বলেন, “গাছ লাগানোর এই কর্মসূচি একটি সমন্বিত উদ্যোগ। এ জন্য আলাদা করে বড় অংকের অর্থের প্রয়োজন হবে না। নতুন করে দেয়া হবে না অতিরিক্ত বরাদ্দও। বরং প্রতিটি সরকারি সংস্থা তাদের নিজস্ব বার্ষিক বাজেট থেকেই নির্ধারিত সংখ্যক গাছ লাগাবে।”
তিনি আরও বলেন, “দেশের বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার (NGO) সঙ্গেও আমরা সমন্বয় করছি। তাদের নিজস্ব অর্থায়নে নির্দিষ্ট সংখ্যক গাছ লাগানোর নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।”
এরই মধ্যে কর্মসূচিটি সমন্বয় ও তদারকির জন্য পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে একটি টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করেছে সরকার। একটি ইন্টারনেটভিত্তিক অ্যাপ্লিকেশন ও ড্যাশবোর্ড তৈরি করছে এই কমিটি। এর মাধ্যমে কতটি গাছ লাগানো হয়েছে, সেগুলোর বর্তমান অবস্থা, কোন সংস্থা গাছগুলো লাগিয়েছে, কী প্রজাতির গাছ রোপণ করা হয়েছে এবং কয়টি এলাকায় এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন হয়েছে এসব তথ্য দেখা যাবে ড্যাশবোর্ডটিতে।
ইসলাম বলেন, গাছ লাগানোর এই কর্মসূচি পাঁচ বছর ধরে চলবে। এ জন্য খাস জমি, নদীর তীর, সড়ক সংলগ্ন জায়গা, সরকারি প্রতিষ্ঠানের চত্বর, বনভূমি উজাড় এলাকা এবং নতুন জেগে ওঠা চর চিহ্নিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, পরিবেশ ও আর্থসামাজিক গুরুত্ব বিবেচনায় এরই মধ্যে বিভিন্ন অঞ্চল নির্বাচন করেছে টাস্কফোর্স কমিটি। সে অনুযায়ী প্রতিটি এলাকার জন্য চারার সংখ্যাও নির্ধারণ করা হয়েছে।
টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য হিসেবেও কাজ করছেন শেখ ফরিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, “নির্বাচিত এলাকাগুলোর মধ্যে উপকূলীয় অঞ্চলের ১৭টি জেলায় ১০ কোটি চারা রোপণ করা হবে। অবক্ষয়িত ম্যানগ্রোভ বন পুনরুদ্ধার এবং এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে ভাঙন ও ঘূর্ণিঝড়জনিত জলোচ্ছ্বাস থেকে সুরক্ষা দিতে এই পরিমাণ গাছ লাগানো হবে এখানে।”
এছাড়া “চট্টগ্রাম পার্বত্য অঞ্চল (CHT), সিলেট এবং দেশটির মধ্যাঞ্চলের শালবনসহ (Shorea robusta) অবক্ষয়িত বন পুনরুদ্ধারে ৫ কোটি চারা রোপণ করা হবে”, জানান ইসলাম।
তিনি আরও বলেন, “বায়ুদূষণ ও তাপদাহের প্রভাব কমিয়ে পরিবেশগত ভারসাম্য গড়ে তুলতে শহরাঞ্চলে ১ কোটি ২৫ লাখ চারা লাগানো হবে।”
“এর বাইরে নদীতীর, অন্যান্য জলাভূমি এবং সড়কের পাশে ৩ কোটি ৭৫ লাখ চারা রোপণ করা হবে। বাকি ৩ কোটি ৭৫ লাখ চারা লাগানো হবে দেশটির বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানের চত্বরে, যার মধ্যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সরকারি দপ্তরও রয়েছে।”

গাছের ধরন ও জায়গা নির্বাচন
বাংলাদেশ বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট আয়তনের ১২ দশমিক ১ শতাংশ বনভূমি। তবে গাছপালার আচ্ছাদন রয়েছে ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ।
গাছ লাগানোর এই কর্মসূচিতে অঞ্চলভিত্তিক পরিবেশগত বৈশিষ্ট্য ও প্রতিবেশ বিবেচনা করে প্রজাতি নির্বাচন করা হচ্ছে। এতে রাখা হয়েছে কাঠ, ফল ও ঔষধিসহ সব ধরনের গাছ। উপকূলীয় এলাকারজন্য নির্বাচন করা হয়েছে কেওড়া (Sonneratia apetala)। আর পাহাড়ি বনাঞ্চলে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে গর্জন (Dipterocarpus turbinatus) গাছকে। এসব অঞ্চলের পরিবেশে সহজে অভিযোজিত হতে পারে এমন অন্যান্য প্রজাতিও থাকছে তালিকায়।
গত কয়েক দশক ধরে, সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় উজাড় বনভূমিতে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনির মতো দ্রুত বর্ধনশীল গাছ লাগিয়ে আসছে বন বিভাগ। এই কর্মসূচিতে গাছপালার দেখাশোনা করে থাকেন বনাঞ্চলের আশপাশের বসবাসকারীরা। নির্দিষ্ট সময় পর, (সাধারণত ২০ বছর পর) গাছ পরিণত হলে তারা সেগুলো কেটে বিক্রি করতে পারেন। লাভের ৪০ থেকে ৬৫ শতাংশ (অঞ্চল ও গাছের ধরনভেদে) তারা পান। বাকি অংশ পায় সরকার ।
তবে পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ও অতিরিক্ত পানি শোষণের কারণে ২০২৫ সালে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমনি রোপণে নিষেধাজ্ঞা দেয় সরকার।
ফরিদুল ইসলাম বলেন, “দেশী প্রজাতির পাশাপাশি কিছু দ্রুত বর্ধনশীল গাছের কথাও বিবেচনা করা উচিত। কারণ, এ ধরনের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারী সাধারণ মানুষ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আর্থিক লাভের আশা করেন। বিশেষ করে যেখানে জীবিকার বিষয়টি জড়িত, সেখানে আমরা এমন ফলদ গাছের কথা ভাবছি, যেগুলো স্বল্প সময়েই তাদের আয় নিশ্চিত করতে পারে।”
তিনি আরও বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শহরাঞ্চলে সৌন্দর্যবর্ধনের কথা বিবেচনা করে কৃষ্ণচূড়া (Delonix regia), জারুল (Lagerstroemia speciosa), সোনালু (Cassia fistula), বকুল (Mimusops elengi) এবং রাধাচূড়া (Peltophorum pterocarpum)-এর মতো গাছ নির্বাচন করা হয়েছে।
ঢাকাভিত্তিক বেসরকারি সংস্থা আরণ্যক ফাউন্ডেশনের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বন বিশেষজ্ঞ ফরিদ উদ্দিন আহমেদ মঙ্গাবে-কে বলেন, “যেসব গাছ বসতবাড়িতে লাগানো হবে, সেগুলোর ক্ষেত্রে সরকারকে দ্রুত বর্ধনশীল প্রজাতির কথা বিবেচনা করা উচিত। তাহলে ভবিষ্যতে আর্থিক লাভের আশা থেকে এসব গাছ লাগাতে আরও আগ্রহী হবে মানুষ।”
তিনি আরও বলেন, “ঔষধি গাছের খুব বড় বাজার নেই বাংলাদেশে। স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ও একমি ল্যাবরেটরিজের মতো হাতে গোনা কয়েকটি বড় ওষুধ তৈরিকারী প্রতিষ্ঠান কিছু ওষুধ তৈরিতে ওষধি উদ্ভিদ ব্যবহার করে। তবে সেসব কাঁচামালও নিজস্ব কৃষিভিত্তিক চাষাবাদ থেকেই সংগ্রহ করে তারা।”

প্রকল্পের সাফল্য ও প্রতিবন্ধকতা
বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে প্রতি বছর ৫ জুন বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুমে গাছ লাগানোর কর্মসূচি পালন করা হয়। তবে এবার যে কর্মসূচি নেয়া হয়েছে, তার পরিধি ও ব্যাপ্তি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বড়। ফলে এটি বাস্তবায়নে প্রয়োজন বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক খালেদ মিসবাহুজ্জামান বলেন, “এত বড় পরিসরে গাছ লাগানোর উদ্যোগ বাস্তবায়নে বেশ কিছু প্রতিবন্ধকতা বিবেচনায় নিতে হবে।”
তিনি বলেন, “প্রথমত, সারা দেশে কোথায় কী ধরনের গাছ লাগানো প্রয়োজন, এ নিয়ে যথাযথ মূল্যায়ন করতে হবে বন বিভাগকে। দ্বিতীয়ত, ভালো মানের চারা সংগ্রহ করাও কঠিন কাজ। কারণ, বেশিরভাগ চারাই বিভিন্ন বেসরকারি নার্সারি থেকে সংগ্রহ করা হয়, যেগুলোর মান অনেক সময়ই প্রত্যাশার তুলনায় খারাপ থাকে।”
দেশজুড়ে ৪৩৫টি সামাজিক বনায়ন নার্সারি ও কেন্দ্র রয়েছে। এসব সরকারি কেন্দ্র থেকে প্রতি বছর গড়ে ৭৫ লাখ চারা উৎপাদন করা হয়।
মিসবাহুজ্জামান বলেন, “তৃতীয় এবং সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো, চারা রোপণের পর সেগুলো রক্ষা করা। এজন্য দরকার কার্যকর পরিচর্যা পরিকল্পনা। এটি নিশ্চিত করা না গেলে, পুরো উদ্যোগের পরিণতি হবে অর্থের অপচয়।”
এসব প্রতিবন্ধকতা বিবেচনায় নিয়ে তিনি বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। তাড়াহুড়া না করে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে কর্মসূচি শুরু করা উচিৎ বলে মনে করেন তিনি। এতে বিভিন্ন প্রতিবেশ অঞ্চল (ecological zones) এবং মানুষের প্রয়োজন বিবেচনায় একটি মৌলিক জরিপও (baseline study) করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন প্রজাতির পর্যাপ্ত চারা প্রস্তুত করারও সুযোগ তৈরি হবে এর মধ্য দিয়ে।

আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পূরণের পথ
জীববৈচিত্র্য বিষয়ক জাতিসংঘের ২০২৪ সালের কনভেনশনের (UN Convention on Biological Diversity) আওতায় দেশের ১৫ শতাংশ অবক্ষয়িত স্থল, উপকূলীয়, স্বাদুপানি ও সামুদ্রিক প্রতিবেশ পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বাংলাদেশ। কার্বন নিঃসরণ কমানো ও প্রাকৃতিক পরিবেশ পূনরুদ্ধারে অবদান রাখতে ২০৩০ সালের মধ্যে এই কর্মসূচী সফল করতে হবে দেশটিকে।
এ ছাড়া, দেশের জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (National Adaptation Plan–NAP,2023-2050) এবং জাতীয়ভাবে নির্ধারিত প্রতিশ্রুতি (Third Nationally Determined Contribution–NDC) উভয় নীতিপত্রেই বনায়নকে (afforestation) বৈশ্বিক উষ্ণায়ন মোকাবিলার একটি প্রশমন (mitigation) কৌশল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশের (ULAB) সেন্টার ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রকৃতিভিত্তিক সমাধান (nature-based solutions) বিষয়ক গবেষক হাসিব ইরফানউল্লাহ। তিনি সরকারের এই বৃহৎ বনায়ন পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়ে মঙ্গাবে-কে বলেন, “সরকার যেহেতু বড় পরিসরে গাছ লাগিয়ে সংরক্ষণ উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে, তাই এই কর্মসূচির ফলাফলের মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নের সঙ্গে সমন্বয় করার সুযোগ তৈরি হয়েছে।”
ব্যানার ছবি: ২০১৮ সালে একটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে স্থানীয়দের অংশগ্রহণ। ছবি: UNDP Bangladesh via Flickr (CC BY-NC 2.0)।
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ ২০২৬ সালের ২০ জুলাই।