- ২০২৬ সালের শুরুর দিকে সুন্দরবন থেকে একটি স্ত্রী বেঙ্গল টাইগার উদ্ধার করে বাংলাদেশ বন বিভাগ। হরিণ শিকারের জন্য পেতে রাখা একটি ফাঁদে আটকা পরে পূর্ণবয়স্ক বাঘটি।
- গুরুতর আহত বাঘটিকে খুলনা বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেওয়া হয়। চিকিৎসা শেষে সেটিকে এখন আবার নিজ আবাসে অবমুক্ত করার জন্য প্রস্তুত বনবিভাগ।
- দেশে এই ধরনের অবমুক্তি বাঘের জন্য প্রথমবার। তাই অবমুক্তির সময় বাঘটির গলায় স্যাটেলাইট কলার পরানো হবে, নাকি ক্যামেরা ট্র্যাপের মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হবে সেটি নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে বিশেষজ্ঞরা।
- গত বছর থেকে হরিণ শিকারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান পরিচালনা করছে বন বিভাগ। এ সময় বিপুল পরিমাণ জাল ও বিভিন্ন ধরনের ফাঁদ জব্দ করা হয়েছে। বন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, শিকারির ফাঁদ থেকে এই বাঘটি উদ্ধার এবং সুন্দরবনে হরিণের সংখ্যা বাড়তে শুরু করা দুটিই এসব অভিযানের ইতিবাচক ফল।
ফাঁদে আটকা পরে বাঘটির সামনের বাম পায়ের চামড়া ভেদ করে মাংস পর্যন্ত কেটে যায়। চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি, সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই ও শরণখোলা রেঞ্জ এলাকা থেকে এরকম অবস্থাতেই ফাঁদ থেকে উদ্ধার করা হয় বাঘটিকে। এটি একটি স্ত্রী বাঘ (Panthera tigris) এবং এর বয়স আনুমানিক ১০ বছর।
প্রায় ছয় মাস চিকিৎসার পর বাঘটিকে আবার বনে অবমুক্ত করার প্রস্তুতি চলছে। শিকারির ফাঁদ থেকে উদ্ধার করে বাঘ অবমুক্তি বাংলাদেশের ইতিহাসে এবারই প্রথম।
গুরুতর আহত বাঘটিকে উদ্ধারের পর প্রথমেই নেয়া হয় বন বিভাগের খুলনা বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে।
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (DFO) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, “হরিণ শিকারের জন্য পেতে রাখা একটি ফাঁদ থেকে আমরা বাঘটিকে উদ্ধার করি। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিচর্যা শেষে এটি এখন আবার বনে ফেরার জন্য প্রস্তুত। কয়েক দিনের মধ্যেই বাঘটিকে অবমুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।”
২০২৪ সালের সবশেষ বাঘ শুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশের সুন্দরবনে বিশ্বব্যাপী বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত ১২৫টি বেঙ্গল টাইগার রয়েছে।

৬,০১৭ বর্গকিলোমিটার (২,৩২৩ বর্গমাইল) আয়তনের সুন্দরবনকে দুটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। প্রশাসনিকভাবে এগুলোর নাম সুন্দরবন পূর্ব ও সুন্দরবন পশ্চিম। এছাড়া বনটিকে চাঁদপাই-শরণখোলা, খুলনা ও সাতক্ষীরা এই তিনটি ব্লকে ভাগ করা হয়েছে।
সবশেষ বন্যপ্রাণী শুমারি অনুযায়ী, চাঁদপাই-শরণখোলা ব্লকেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক বেঙ্গল টাইগারের বসবাস।
“এছাড়া এই ব্লকে হরিণ, বুনো শূকরসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর ঘনত্বও তুলনামূলক বেশি। ফলে এই অংশেই সবচেয়ে বেশি বাঘের উপস্থিতি ” বলেন চৌধুরী।
তিনি আরও বলেন, “ ব্যনপ্রানীর উপস্থিতির হার বেশি থাকায়, তাদের শিকারসহ বিভিন্ন ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডও তাই এখানেই বেশি চলে।”

অবমুক্তির পদ্ধতি নিয়ে মতপার্থক্য
দেশে এই প্রথমবারের মতো একটি বেঙ্গল টাইগারকে চিকিৎসার পর আবার বনে অবমুক্ত করা হচ্ছে। একেবারে নতুন এই ঘটনাটি নিয়ে তাই বেশ কিছু মতবিরোধ দেখা দিয়েছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। একদল বিশেষজ্ঞের মতে, বাঘটির গলায় স্যাটেলাইট কলার পরানো উচিত, যাতে বনে ছাড়ার পর তার গতিবিধি ও শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যায়। অন্যদিকে আরেক দল বলছেন, গুরুতর আঘাত ও দীর্ঘ চিকিৎসার পর সুস্থ হয়েছে বাঘটি। এ অবস্থায় গলায় অতিরিক্ত যন্ত্র বহন করা বা আবার অজ্ঞান করার চাপ তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
এসব ক্ষেত্রে অবমুক্ত করার সময় জিপিএস-সংযুক্ত কলার ব্যবহার বিশ্বজুড়ে একটি প্রচলিত পদ্ধতি। প্রতিবেশী দেশ ভারত ও নেপালেও নিয়মিত এ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। ঢাকার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ বলেন, “বিশ্বজুড়ে প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরণ করে আমরা জিপিএস ট্র্যাকার লাগিয়েই বাঘটিকে অবমুক্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”
বাঘ অবমুক্তি তদারকির জন্য গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্যও তিনি। আজিজ বলেন, “গত ছয় মাস ধরে বাঘটি নিজের এলাকায় ছিলোনা। এই সময়ে, সে তার দখল করা এলাকা হারিয়ে ফেলতে পারে। ফলে খাবারের সন্ধানে কাছাকাছি কোনো লোকালয়ে চলে আসার আশংকাও রয়েছে এটির।”
তিনি আরও বলেন, “বাঘটির গলায় জিপিএস ট্যাগ থাকলে আমরা তার চলাচল পর্যবেক্ষণ করতে পারবো। সে যদি আবার লোকালয়ের দিকে আসে, তাহলে স্থানীয়দের আগেই সতর্ক করা সম্ভব হবে। এসব দিক বিবেচনায় কলার পরানোই সবচেয়ে ভালো বিকল্প।”
তবে গাজীপুর সাফারি পার্কের পশু চিকিৎসক (vaterinary) হাতেম সাজ্জাত মো. জুলকারনাইন মনে করেন, “গলায় কলারের মতো অতিরিক্ত যন্ত্র লাগিয়ে বাঘটিকে অবমুক্ত করলে, তার জীবনের ঝুঁকি বাড়তে পারে।” আহত বাঘটির চিকিৎসা করেছেন জুলকারনাইন।
তিনি মঙ্গাবেকে বলেন, “আমরা বাঘটিকে খুবই সংকটাপন্ন অবস্থায় উদ্ধার করেছিলাম। ধাতব ফাঁদে আটকে তার সামনের বাম পা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চিকিৎসার পর সে সুস্থ হয়েছে ঠিকই, তবে এরইমধ্যে তার শক্তি ও স্বাভাবিক ক্ষিপ্রতা অনেকটাই কমে গেছে।”
তিনি আরও বলেন, “এই অবস্থায় নিজের এলাকা পুনরুদ্ধার করা এবং শিকার ধরে খাবার জোগাড় করাই তার জন্য কঠিন। এর ওপর অতিরিক্ত ওজন বহন করতে হলে, বনে টিকে থাকা তার জন্য আরও কঠিন হয়ে পড়বে।”

বিকল্প হিসেব থাকলো ক্যামেরা ট্র্যাপ।
এটি ব্যবহারের কথাও ভাবা হচ্ছে।
মোহাম্মদ আবদুল আজিজ বলেন, “আমরা বাঘটির গলায় রেডিও কলার লাগানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে সময়মতো প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সংগ্রহে প্রযুক্তিগত জটিলতা থাকায় বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে যদি কলার সংগ্রহ করা সম্ভব না হয়, তাহলে আমরা ক্যামেরা ট্র্যাপ ব্যবহার করবো। সেক্ষেত্রে বাঘটি যে এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল, সেই ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে বন বিভাগ ক্যামেরা বসিয়ে তার অবস্থান ও চলাচল পর্যবেক্ষণ করবে।”
তবে তিনি মনে করেন, বাঘটি যদি ক্যামেরা নজরদারির সীমার বাইরে চলে যায়, তাহলে তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা আর সম্ভব নাও হতে পারে।

হরিণ শিকার রোধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান
সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বিভিন্ন ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের মধ্যে হরিণ শিকার এখনোবড় সংকট। অভিযোগ আছে, বনাঞ্চলের আশপাশে বসবাসকারী এবং জীবিকার জন্য সুন্দরবনের সম্পদের ওপর নির্ভরশীল কিছু মানুষ এসব অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত।
বন বিভাগের এক তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে সুন্দরবনের পূর্বাঞ্চল থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার জুড়ে পেতে রাখা দড়ি ও ধাতব তারের ফাঁদ অপসারণ করা হয়েছে। এছাড়া শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে অন্তত ৭০ জন শিকারিকে।
শিকারির ফাঁদ থেকে বাঘটিকে উদ্ধার, বন বিভাগের সাম্প্রতিক কঠোর অভিযানেরই প্রতিফলন। টহল জোরদার এবং শিকারিদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযানের মাধ্যমে এই সাফল্য এসেছে।

সম্প্রতি সুন্দরবন ঘুরে আসা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মোস্তফা ফিরোজ বলেন, “এসব অভিযানের ফলে সুন্দরবনে হরিণের সংখ্যাও চোখে পড়ার মতো বেড়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “আমি বেশ কয়েকটি স্ত্রী হরিণের সঙ্গে তিনটি করে শাবকও দেখেছি। সুন্দরবনে এমন দৃশ্য দীর্ঘদিন ধরে খুবই বিরল ছিলো।”
ব্যানার ছবি: খুলনা বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন বাঘটি। ছবি: বাংলাদেশ বন বিভাগ।
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ ২০২৬ সালের ১০ জুলাই।