- এ বছর ১ জুলাই থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বিদ্যুৎচালিত যানবাহন আমদানির ওপর শুল্ক মওকুফের ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ১১ জুন জাতীয় বাজেট ঘোষণায় এ তথ্য জানান অর্থমন্ত্রী। এসব বাহনের মধ্যে রয়েছে বাস, ট্রাকসহ অন্যান্য আরো কিছু গাড়ি। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানি চালিত যানবাহনের ওপর বাড়ানো হয়েছে শুল্ক।
- বিদ্যুৎ চালিত যানবাহন বা EV চার্জিং স্টেশন স্থাপনের ক্ষেত্রেও শুল্ক ছাড়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
- প্যারিস জলবায়ু চুক্তির আওতায় জাতীয়ভাবে নির্ধারিত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, বাংলাদেশের ২৫ শতাংশ বাস ও ট্রাক এবং ৩০ শতাংশ ব্যক্তিগত গাড়ি ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ চালিত যানবাহনে রূপান্তর করতে চায় সরকার।
- জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর পাশাপাশি, কার্বন নিঃসরণ ও বায়ু দূষণ কমানোর ওপরও জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ। প্রতি বছর বায়ু দূষণের কারণে দেশটিতে কয়েক লাখ মানুষের মৃত্যু হয়।
বিদ্যুৎ চালিত যানবাহনের (EV) ওপর উচ্চ কর আরোপ এবং জীবাশ্ম জ্বালানি (Diesel) চালিত পরিবহনকে উৎসাহ দেওয়ার আগের নীতি থেকে সরে এসেছে বাংলাদেশ। পরিবেশগত ক্ষতি মোকাবিলায় এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে সরকারি বক্তব্যে উঠে আসে বিষয়টি।
আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন অর্থবছরের কর ও শুল্ক প্রস্তাব উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিষয়টি পরিস্কার করেন। ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট বক্তৃতায় EV ও সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে সমন্বিত শুল্ক কাঠামোর ঘোষণা দেন চৌধুরী। মূলত কার্বন নিঃসরণ কমানো এবং বায়ু দূষণ মোকাবিলা করাই এর লক্ষ্য।
বিদ্যুৎ চালিত বাস ও ট্রাক আমদানিতে শূন্য শুল্ক, EV চার্জিং স্টেশন স্থাপনে শুল্ক ছাড় এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে কর প্রণোদনা ঘোষণা দেওয়া হয়েছে বাজেট প্রস্তাবে। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানি চালিত যানবাহনের ওপর শুল্ক বাড়ানো, EV-এর নিবন্ধন ফি কমানো এবং পরিবহন খাতের দূষণ কমাতে বিভিন্ন প্রণোদনা চালুর প্রস্তাবও করা হয় ঘোষণায়। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণের প্রায় ৯ শতাংশের জন্য দায়ী এই পরিবহন খাত।
পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়সেন দীর্ঘদিন ধরেই নানা জল্পনা-কল্পনা চলছে বাংলাদেশে। তবে এ খাতে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে এটিই সরকারের প্রথম সমন্বিত উদ্যোগ। কারণ, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোতে হাজার হাজার ডিজেল চালিত বাস ও ট্রাকের নির্গত দূষণ বাতাসকে আরও ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
জাতিসংঘের হিসেবে, বাংলাদেশে প্রতি বছর বায়ু দূষণজনিত রোগে ২ লাখ ৩৫ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। এ ছাড়া হাঁপানি ও শ্বাসতন্ত্রের অন্যান্য রোগে ভোগেন আরও কয়েক লাখ মানুষ।

কর ছাড় ও প্রণোদনা
অর্থমন্ত্রী বলেন, “EV বাস ও ট্রাক আমদানিতে মূল্য সংযোজন কর ছাড়া সব ধরনের শুল্ক ও কর সম্পূর্ণ মওকুফ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আমি এই সুবিধা ২০৩০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত বহাল রাখার প্রস্তাব করছি।”
তিনি আরও বলেন, “EV নির্বিঘ্নে পরিচালনা করতে দেশব্যাপী চার্জিং স্টেশন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা জরুরি। এ লক্ষ্যেই EV চার্জার ও চার্জিং স্টেশনের ওপর মোট করের হার ৩৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নামিয়ে আনার প্রস্তাব করছি।”
এর বাইরে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ খাতে শূন্য শতাংশ কর হার বহাল রাখার ঘোষণা দেন তিনি। পাশাপাশি, সৌরবিদ্যুতের বিল পরিশোধের বিপরীতে ৫ শতাংশ কর ছাড় দেয়ার প্রস্তাবও করেন অর্থমন্ত্রী।
তিনি বলেন, “আমি যানবাহনের ধরন অনুযায়ী সম্পূরক শুল্ক কমানোর প্রস্তাব করছি। এছাড়া ১ হাজার ৮০০ সিসি (১ দশমিক ৮ লিটার) পর্যন্ত ইঞ্জিন ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ির ওপর নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের বিষয়টিও প্রস্তাবে আছে।”
“বর্তমানে উচ্চ করের কারণে বেশির ভাগ নাগরিকের নাগালের বাইরে রয়েছে EV” -এ কথা উল্লেখ করে এসব গাড়ির ওপর কর কমানোর ঘোষণাও দেন মন্ত্রী।
অর্থমন্ত্রী, এ সময় জীবাশ্ম জ্বালানি চালিত যানবাহনের ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোল চালিত যানবাহনের ওপর কর বাড়ানোর প্রস্তাবও দেন। এসব জ্বালানি নির্ভর গাড়ি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর।
প্রস্তাব পাশ হলে, নতুন কর কাঠামো অনুযায়ী, ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ সিসি (১ দশমিক ২–১ দশমিক ৬ লিটার) ইঞ্জিন ক্ষমতার গাড়ির মালিকদের বর্তমান কর বাড়বে। ১৩২ শতাংশের পরিবর্তে প্রায় ১৫৬ শতাংশ শুল্ক পরিশোধ করতে হবে তাদের।
জাতীয় সংসদে ক্ষমতাসীন দলের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায়, অর্থমন্ত্রীর এসব প্রস্তাব অনুমোদন পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নিশ্চিত।

বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক প্রভাত সাহা মঙ্গাবে-কে বলেন, “সরকারের এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়। কারণ, ভবিষ্যতে আমাদের শূন্য-নিঃসরণ প্রযুক্তিতে (zero-emission technology) যেতেই হবে।”
তবে শুধুমাত্র এই উদ্যোগ, বায়ু দূষণ কমানোর জন্য যথেষ্ট হবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে এই শিক্ষকের।
প্রভাত সাহা বলেন, “আমার মনে হয়, বাংলাদেশে বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে শুধু এসব পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়। পরিবহন খাতের কথা যদি বলি, তাহলে বড় ট্রাক ও লরিগুলোই এ খাতের দূষণের জন্য সবচেয়ে বেশি দায়ী। অথচ এসব বড় ট্রাক ও লরি এখনো বিদ্যুৎ চালিত নয়।”
মঙ্গাবে-কে একজন পরিবহন ব্যবসায়ীও সরকারের উদ্যোগটি নিয়ে আশাবাদ জানিয়েছেন। তবে সরকারের এই পরিকল্পনা নিয়ে সতর্ক রয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশ বাস-ট্রাক মালিক সমিতির নেতা সাইফুল ইসলাম মঙ্গাবে-কে বলেন, “আমরা সরকারের এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানাই। তবে এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেক জটিলতাও সামনে আসবে। উদ্যোগটি সফল করতে সরকারকে সেগুলোর সমাধান করতে হবে আগে।”
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, বিদ্যুৎ চালিত বাস ও ট্রাক চালু করতে লাগবে নতুন অবকাঠামো, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তিগত জ্ঞান, খুচরা যন্ত্রাংশের সহজলভ্যতা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা গড়ে তুলতে হবে।
সাইফুল ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশে বিদ্যুৎ চালিত বাস ও ট্রাক তৈরি হয় না। এগুলো আমাদের আমদানি করতে হবে।”
তিনি বলেন, “এসব যানবাহন চালুর আগে পর্যাপ্ত চার্জিং স্টেশন, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দক্ষ কারিগর এবং প্রয়োজনীয় খুচরা যন্ত্রাংশের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু বাস-ট্রাক আমদানি করে রাস্তায় নামিয়ে দিলেই চলবে না।”
“EV-র দাম ডিজেল চালিত বাস-ট্রাকের প্রায় তিন গুণ। আমরা জেনেছি, এগুলো প্রায় ১০ বছর ঠিকঠাক মত চলে। সেক্ষেত্রে খরচ ও লাভের বিস্তারিত বিশ্লেষণ করতে হবে। এমনও হতে পারে, এসব বাহনে এখনকার তুলনায় অনেক বেশি ভাড়া গুনতে হবে যাত্রীদের”-মনে করেনস সাইফুল।
তিনি আরও বলেন, “পরিচালনাগত সমস্যাও রয়েছে এই উদ্যোগে। বর্তমানে একটি বাসে জ্বালানি নিতে সময় লাগে পাঁচ মিনিট বা এর কাছাকাছি সময়। তবে EV-এর ক্ষেত্রে এটি হবে বেশ কয়েকগুণ বেশি। যাত্রীরা এ বিষয়টি কিভাবে মেনে নেবে তা নিয়ে রয়েছে সংশয়।”
সরকার নীতিগত সহায়তা না দিলে, আমাদের পক্ষে বিদ্যুৎ চালিত বাস ও ট্রাক পরিচালনা শুরু করা সম্ভব হবে না বলে, সতর্ক করেন সাইফুল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক আনিসুর রহমান মঙ্গাবে-কে বলেন, EV চালুর উদ্যোগ নেওয়ার আগে সরকারের উচিত ছিলো একটি সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা।
তিনি বলেন, “ভাড়া বেড়ে গেলে ভোক্তারা অসন্তুষ্ট হবেন এবং অভিযোগ করবেন। তবে সেবার মান ভালো হলে এটি সহজভাবে গ্রহণও করবেন যাত্রীরা। তাই আমাদের চেষ্টা করতে হবে যাত্রীদের যথাযথ সেবা নিশ্চিত করা।”
এ ছাড়া আনিসুর রহমান বলেন, মানুষের কল্যাণের জন্যই সরকারের এই উদ্যোগ, সে বিষয়টিও অনুধাবন করতে ভোক্তাদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের জলবায়ু পরিবর্তন সেলের পরিচালক মির্জা শওকত আলী মঙ্গাবে-কে বলেন, প্যারিস জলবায়ু চুক্তির অধীনে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নিজস্ব লক্ষ্য, প্রতিশ্রুতি ও কর্মপরিকল্পনা (Nationally Determined Contribution-NDC) নিয়ে শর্তহীন এবং শর্তসাপেক্ষ দুই ভাবেই অঙ্গিকারাবদ্ধ বাংলাদেশ। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ কমানোর অংশ হিসেবেই বিদ্যুৎ চালিত যানবাহন চালুর উদ্যোগ নেয় সরকার।
আলী আরও বলেন, “বাংলাদেশ সবসময় জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। তবে এখন আমরা প্রশমন (Mitigation) কার্যক্রমেও জোর দিচ্ছি। বৈদ্যুতিক যানবাহনের জন্য শুল্ক ছাড় সেই উদ্যোগেরই একটি অংশ।”
বিদ্যুৎ চালিত যানবাহনের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছিলো বিগত সরকার। ফলে এসব বাহন ছিলো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। নতুন এই উদ্যোগ, ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের ২৫ শতাংশ বাস ও ট্রাক এবং ৩০ শতাংশ ব্যক্তিগত গাড়িকে বিদ্যুৎ চালিত যানবাহনে রূপান্তরের লক্ষ্যে এগিয়ে যাওয়ার প্রথম পদক্ষেপ, মনে করেন আলী।
ব্যানার ছবি: ঢাকায় বায়ু দূষণ থেকে বাঁচতে মুখ ঢেকে রেখেছেন এক অটো রিকশাচালক। ছবি: AP Photos/Mahmud Hossain Opu.
নিবন্ধটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল-এ ২০২৬ সালের ৩০ জুন।