- উদ্ভিদবিজ্ঞানী ও প্রতিবেশকর্মী পাভেল পার্থের মতে, বাংলাদেশের পরিবেশ নীতিগুলোতে উদ্ভিদ ও মানুষের মধ্যকার নিবিড় সম্পর্ককে উপেক্ষা করা হয়েছে। নীতিমালাগুলোয় পরিবেশ সংরক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হলেও প্রতিবেশগত বিষয়বস্তুকে খুব একটা আমলে নেওয়া হয়নি।
- যেকোনো উন্নয়নমূলক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে প্রতিবেশগত ও সামাজিক, উভয় ধরনের প্রভাবই বিবেচনা করা উচিত বলে মনে করেন তিনি। কারণ, এই দুটি বিষয় একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
- চলমান পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে প্রতিবেশ ব্যবস্থার পাশাপাশি ভাষা, সংস্কৃতি চর্চা এবং ঐতিহ্যবাহী প্রতিবেশগত জ্ঞানও হারিয়ে যাচ্ছে বলে সতর্ক করেন তিনি।
- পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হওয়া আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে বৈজ্ঞানিক গবেষণা কীভাবে সহায়তা করতে পারে এবং সেই সঙ্গে প্রতিবেশ আন্দোলনের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা নিয়ে মঙ্গাবে-র সাথে কথা বলেছেন পাভেল পার্থ।
প্রায় দুই বছর আগের কথা। ২০২৪ সালে ঢাকার পান্থকুঞ্জ পার্ক রক্ষা আন্দোলনের এক অবস্থান কর্মসূচিতে গবেষক ও প্রতিবেশকর্মী পাভেল পার্থের সাথে আমার প্রথম দেখা। পার্কের গাছ কেটে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের র্যাম্প তৈরির বিরুদ্ধে তখন আন্দোলন চলছিল। সেখানেই কয়েকজন আন্দোলনকারীকে নিয়ে তৈরি একটি অস্থায়ী তাঁবুতে বসে এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের ফলে সেখানকার ক্ষতিগ্রস্ত উদ্ভিদ, পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণীর একটি বিস্তারিত তালিকা তৈরি করছিলেন তিনি। তার এই ব্যতিক্রমী কাজ তখন সবার নজর কেড়েছিল। তালিকা তৈরির কারণ জানতে চাইলে এই গবেষক জানান, ‘প্রতিবেশ গড়ে তোলা গাছপালা ও অন্যান্য প্রাণীরও সমাজে স্বীকৃতি এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে।’
পেশায় জন-উদ্ভিদবিদ পাভেল পার্থ প্রায় দুই দশক ধরে জন-উদ্ভিদবিদ্যা (মানুষ ও উদ্ভিদের পারস্পরিক সম্পর্কের বিজ্ঞান) নিয়ে গবেষণা করছেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি বাংলাদেশের উদ্ভিদবৈচিত্র্য এবং আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী জ্ঞান নথিবদ্ধ করার কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। কেবল গবেষণাগার বা মাঠপর্যায়ের কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি; আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষা এবং তাদের জীবন-জীবিকার সুরক্ষায় বিভিন্ন পরিবেশ আন্দোলনেও তাকে সামনের সারিতে দেখা যায়। বর্তমানে তিনি Bangladesh Resource Center for Indigenous Knowledge (BARCIK)-এর পরিচালক হিসেবে কর্মরত। ২০০৩ সাল থেকে এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি তার গবেষণা ও সামাজিক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।

মঙ্গাবে-র সাথে এই সাক্ষাৎকারে পাভেল পার্থ তার গবেষণা ও প্রতিবেশ আন্দোলনের দর্শন তুলে ধরেছেন। একইসঙ্গে প্রতিবেশগত ন্যায়বিচারের গুরুত্ব এবং সংকটে থাকা আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে বৈজ্ঞানিক গবেষণা কীভাবে সহায়তা করতে পারে, তা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করেন তিনি। প্রকাশের সুবিধার্থে সাক্ষাৎকারটি কিছুটা সংক্ষিপ্ত ও পরিমার্জন করা হয়েছে।
আপনার এই যাত্রার শুরুটা জানতে চাই। প্রকৃতি সুরক্ষায় লড়াই করার তাগিদ কবে প্রথম অনুভব করেছিলেন?
মানুষ এই বিশাল পৃথিবীরই একটা অংশ মাত্র – এই কথাটি আমাকে শিখিয়েছিলেন আমার দাদি। ছোটবেলা থেকেই আমি ‘ধরিত্রী মা’ শব্দটি শুনে শুনে বড় হয়েছি। আমার শিশুমনে শব্দটি গভীর রেখাপাত করেছিল। পরবর্তীতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগে যখন ভর্তি হই, তখন প্রতিবেশ নিয়ে আমার আগ্রহ আরও বাড়ে এবং এ বিষয়ে প্রচুর পড়াশোনা শুরু করি। তবে প্রতিবেশ বা ইকোলজি নিয়ে আমার দৃষ্টিভঙ্গি তখনও পুরোপুরি স্পষ্ট ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থাকাকালীনই আমি পার্বত্য চট্টগ্রাম, শালবন, চা বাগান, নদী ও উপকূলীয় অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়াতাম। সময় কাটাতাম আদিবাসী জনগোষ্ঠী, স্থানীয় মানুষ, কৃষক ও জেলেদের সাথে। শুরুতে আমি কেবলই একজন প্রকৃতিপ্রেমী ছিলাম, তবে মনের ভেতর এক ধরনের দায়িত্ববোধ সবসময় কাজ করত।
পরবর্তীতে স্থানীয় ও আদিবাসী মানুষের সান্নিধ্য আমার প্রতিবেশগত চিন্তাভাবনাকে একটি সুনির্দিষ্ট রূপ দিতে সাহায্য করে। এর আগে আমি পরিবেশ আন্দোলনের বিভিন্ন প্রচলিত মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত ছিলাম; কাজ করতাম মানবতাবাদী বা প্রাণকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আদিবাসী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর লোকায়ত জ্ঞান এবং প্রকৃতির সাথে তাদের নিবিড় সম্পর্ককে যতই কাছ থেকে দেখেছি, ততই আমি প্রতিবেশকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির দিকে ঝুঁকে পড়েছি।
আপনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছেন এবং বাংলাদেশে একেবারে প্রথম দিকের একটি জন-উদ্ভিদবিষয়ক গবেষণা পরিচালনা করেছেন। বিজ্ঞান ও মানুষের এই মেলবন্ধনের প্রতি আপনি কীভাবে আকৃষ্ট হলেন?
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই আমাদের প্রচলিত জ্ঞানব্যবস্থার ভেতরের বৈষম্যগুলো আমার চোখে পড়ে। আমি দেখতাম, আদিবাসী ও স্থানীয় মানুষের লােকায়ত জ্ঞানকে কীভাবে অবহেলা করা হয়। আবার অনেক সময় গবেষণার নামে তাদের সেই জ্ঞান চুরিও করা হতো। এসব দেখে ধীরে ধীরে আদিবাসীদের লোকায়ত জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ওপর আমার আস্থা বাড়তে থাকে। একই সাথে বিজ্ঞানকে প্রাতিষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক, এমন দুটি কৃত্রিম ভাগে ভাগ করার ধারণাকে আমি প্রশ্নবিদ্ধ করতে শুরু করি। আমার মনে হয়, বিজ্ঞান তো বিজ্ঞানই; একে এভাবে ভাগ করা যায় না।
বাংলাদেশের ১৪টি ভিন্ন ভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে যখন আমি জন-উদ্ভিদবিষয়ক গবেষণা শুরু করি, তখন তাদের খুব কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ হয় আমার। তাদের জীবনযাত্রা থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। আমি বুঝতে পারি, তাদের নিজস্ব উদ্ভিদ ও প্রতিবেশগত জ্ঞান অত্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক একটি বিজ্ঞান।

একটি উদাহরণ দেওয়া যাক। মৌলভীবাজারের এক চিরহরিৎ বন এলাকায় খাসিয়া সম্প্রদায়ের একটি পুঞ্জিতে জন-উদ্ভিদবিষয়ক গবেষণার কাজ করছিলাম। তখন সেখানকার একজন খাসিয়া কবিরাজের কাছ থেকে অনেক কিছু শেখার সুযোগ হয়। তিনি আমাকে এমন অনেক গাছপালা দেখিয়েছিলেন, যা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্ভিদ শ্রেণিবিন্যাস বা শনাক্তকরণের দৃষ্টিতে খুবই সাধারণ। তারপরও তাদের লোকায়ত চিকিৎসা পদ্ধতি আমার কাছে অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য এবং বিজ্ঞানসম্মত মনে হয়েছে।
যেমন, Araceae গোত্রের একটি উদ্ভিদ ‘নিয়াং-সোয়াত’ এর কথা বলা যায়। আমার স্নাতকোত্তরের থিসিসে খাসিয়া সম্প্রদায়ের সাথে এই উদ্ভিদের নৃতাত্ত্বিক সম্পর্কের কথা আমি প্রথম নথিবদ্ধ করি। ফোড়া ও খোসপাঁচড়ার চিকিৎসায় তারা এটি ব্যবহার করে। আমি লক্ষ্য করেছি, আদিবাসী মানুষ কেবল উদ্ভিদের ব্যবহারই বোঝে না, বরং এগুলো কোন পরিবেশে জন্মায়, কোন কোন পশুপাখি এগুলোর ওপর নির্ভরশীল এবং জীবন বাঁচিয়ে রাখার পেছনে সামগ্রিক প্রতিবেশগত সম্পর্কগুলো কী — সেটিও তারা খুব ভালো করে জানে। তাদের এই জন-প্রতিবেশগত জীবনদর্শন অনেক দিক থেকেই আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক বিজ্ঞানের চেয়ে অনেক বেশি সামগ্রিক ও বিজ্ঞানসম্মত। আদিবাসী সম্প্রদায়ের অনেক লােকায়ত চর্চা, যেমন গুচ্ছ বন (sacred groves) রক্ষা করা, পাশাপাশি স্থানীয় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বড় ভূমিকা রেখেছে। এই জ্ঞানব্যবস্থাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং সেগুলো থেকে শিক্ষা নেওয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আপনি পরিবেশসহ বেশকিছু সামাজিক আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। এমন কোনো মুহূর্ত কি ছিল যখন আপনার মনে হয়েছে, কেবল নথিবদ্ধ করাই যথেষ্ট নয়, তাদের পাশে দাঁড়িয়ে দাবি আদায়ের লড়াইয়েও নামা প্রয়োজন?
আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন, তৎকালীন সরকার মৌলভীবাজারের মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত এলাকায় একটি ইকো-পার্ক প্রকল্প হাতে নেয়। ১৯৯৯ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে তারা একটি বিশাল এলাকা জুড়ে এই পার্ক করার প্রস্তাব দেয়। ওই এলাকাটি ছিল চা বাগানের খাসিয়া আদিবাসী শ্রমিক সম্প্রদায় এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত একটি পবিত্র স্থান। খাসিয়া সম্প্রদায় যখন এই প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করে, তখন আমিও তাদের সাথে ইকো-পার্ক বিরোধী আন্দোলনে শামিল হই। সেই আন্দোলনের দিনগুলোতে খাসিয়া সম্প্রদায়ের কাছ থেকে আমি অনেক কিছু জানতে পারি।
এরপর আমি বিবিয়ানা লং মার্চ তথা বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র এবং ফুলবাড়ী কয়লাখনি বিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণআন্দোলনে যুক্ত হই। এসব আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমি বুঝতে পারি, কেবল রাজপথে অংশগ্রহণ করাই যথেষ্ট নয়, বরং আন্দোলনের পেছনের যুক্তিগুলো নথিবদ্ধ করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একই সাথে আমি লক্ষ্য করি, প্রতিবেশ নিয়ে স্থানীয় মানুষের নিজস্ব জ্ঞান ও বিশ্লেষণগুলোকে কখনোই সেভাবে নথিবদ্ধ করা হয়নি। আমি এই গণআন্দোলনগুলোকে গভীরভাবে বোঝার চেষ্টা করেছি। দেখেছি, মূলধারার সমাজ যখন এই আন্দোলনগুলোকে দেখে তখন স্থানীয় মানুষের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়। যেন এগুলো কেবলই একটি নদী বাঁচানো বা পুকুর রক্ষার সাধারণ আন্দোলন। অথচ প্রাকৃতিক প্রতিবেশের সাথে তাদের যে নিবিড় সম্পর্ক এবং সেই সম্পর্কের লৌকিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দিকগুলো খুব কমই স্বীকৃতি পায়। মূলত এই শূন্যতা পূরণের তাগিদ থেকেই আমি এই কাজের সাথে যুক্ত হয়েছি।

আপনি সবসময়ই বলেন, যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রতিবেশগত ন্যায়বিচারকে কেন্দ্রে রাখা উচিত। এদিকে বাংলাদেশে উন্নয়ন এবং পরিবেশ সংরক্ষণকে প্রায়ই দুটি আলাদা বিষয় হিসেবে দেখা হয়। এটি দেশের পরিবেশগত শাসন প্রক্রিয়াকে কীভাবে প্রভাবিত করেছে এবং প্রতিবেশগত ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে হলে কী ধরনের পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করেন?
বাংলায় ‘ইকোলজি’-র প্রতিশব্দ হলো ‘প্রতিবেশ’। এই ধারণাটি এসেছে আমাদের অতি পরিচিত ‘প্রতিবেশী’ শব্দ থেকে। আমাদের পাশে যারা থাকেন, তাদের আমরা প্রতিবেশী বলি। আর এই প্রতিবেশী কিন্তু কেবল মানুষ নয়; গাছপালা, পাখি, মাছ এবং সমস্ত জীব ও জড় উপাদান, সেই সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ উপাদান, সবই এর অন্তর্ভুক্ত। তবে আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতিগুলোতে এই ভাবনার কোনো প্রতিফলন নেই। এর পরিবর্তে আমরা বন সংরক্ষণ, নদী সংরক্ষণ বা পরিবেশ সংরক্ষণের কথা আলাদা আলাদাভাবে বলি। কিন্তু এদের মধ্যকার পারস্পরিক নিবিড় সম্পর্কটিকে বোঝার চেষ্টা না করে বরং উপেক্ষা করি।
এর ফলে বাংলাদেশের মূলধারার পরিবেশগত শাসন প্রক্রিয়ায় এমন সব নীতি দেখা যায়, যা প্রতিবেশগত সম্পর্কগুলোকে পুরোপুরি বুঝতে ব্যর্থ হয়। কোনো প্রকল্পের ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণ (EIA) করা হলে এবং সেখানে প্রতিবেশগত প্রভাবের কথা উল্লেখ থাকলেও, সামাজিক প্রভাব নিরূপণ (SIA) প্রায় কখনোই করা হয় না। অথচ প্রতিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব একে অপরের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ আমরা চলন বিলের মতো গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমির বুক চিরে বড় বড় রাস্তা তৈরির মতো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত দেখতে পাই।
সংরক্ষণের নামে আমরা বোটানিক্যাল গার্ডেন, সাফারি পার্ক বা চিড়িয়াখানা তৈরি করি কিন্তু এগুলো কোনো প্রতিবেশগত সমাধান নয়। আমার মনে হয়, আমাদের রাষ্ট্র ও নীতি কাঠামো অত্যন্ত মানবকেন্দ্রিক হওয়াটাই এক্ষেত্রে মূল সমস্যা। এটি কেবল মানুষকে কেন্দ্রে রেখে উন্নয়নের পরিকল্পনা করে। আমাদের এই মানবকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনার বাইরে গিয়ে প্রতিবেশগত সম্পর্ক এবং প্রতিবেশগত ন্যায়বিচারের কথা ভাবতে হবে। বাংলাদেশের আইন ও নীতিগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়লে এই ঘাটতি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরিবেশ, প্রতিবেশ এবং প্রকৃতি নিয়ে রাষ্ট্রের এখনও কোনো সমন্বিত বা সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে ওঠেনি। উদাহরণস্বরূপ, পানি নীতি, বন নীতি এবং পরিবেশ নীতিতে বলা হচ্ছে, কৃষি রাসায়নিক আমাদের জন্য ক্ষতিকর। অথচ একই সময়ে অন্যান্য অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক নীতিমালার মাধ্যমে রাসায়নিক সারের ব্যবহারকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

আপনি কয়েক দশক ধরে বন, গ্রাম, চা বাগান এবং আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। আপনার অভিজ্ঞতায় কোন কোন জিনিস হারিয়ে যেতে দেখেছেন?
আমি আমার অনেক লেখায় বলেছি, আমরা যদি আমাদের পাখি হারাই তবে একই সাথে আমরা শব্দভাণ্ডারও হারাই। অর্থাৎ, এটি আমাদের ভাষাতত্ত্বকেও প্রভাবিত করে। যেমন, ১৯৯৭ সালে মার্কিন কোম্পানি অক্সিডেন্টালের কারণে শ্রীমঙ্গলের মাগুরছড়ায় যে গ্যাসক্ষেত্র বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তাতে প্রচুর গাছপালা, বন্য মাশরুম এবং ঔষধি গাছ ধ্বংস হয়ে যায়। ওই এলাকায় খাসিয়া ও ত্রিপুরা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস। ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি উদ্ভিদ রয়েছে যাকে তারা বলে ‘কুথুই-রোগনি-খলুম’ (Ixora arbore ); এই উদ্ভিদে সাদা ফুল ফোটে। তাদের বিশ্বাস, কেউ মারা গেলে মৃত ব্যক্তির আত্মা এই ফুলের পথ ধরে স্বর্গে যায়। ওই দুর্ঘটনার পর অনেক গাছপালাই আর টিকে থাকতে পারেনি, কুথুই-রোগনি-খলুমও হারিয়ে গেছে। নতুন প্রজন্ম এখন আর এই নামগুলো জানে না, এই চর্চাগুলোও হারিয়ে গেছে এবং তাদের বিশ্বাসেও পরিবর্তন এসেছে। আমার কাজের সুবাদে আমি দেখেছি যে অনেক দেশীয় মাছ, ধানের জাত এবং গাছপালা এরইমধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে। ফলে স্থানীয় সম্প্রদায়ের নিজস্ব পরিচয় এবং ঐতিহ্যগত জ্ঞানও হারিয়ে যাচ্ছে। আমি আরও দেখেছি যে শেরপুর, জামালপুর, নেত্রকোনা এবং অন্যান্য এলাকায় খনিজ সম্পদ উত্তোলনের নামে আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে তাদের জমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। যার ফলে তারা নিজস্ব জীবনযাত্রা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। আমি তাদের অনেক জ্ঞান নথিবদ্ধ করেছি। অবশ্য সম্প্রদায়ের মানুষ এখন আর সেগুলো চর্চা করে না। কারণ সেই গাছপালা ও প্রাণীরা এখন আর তাদের এলাকায় নেই। আমি একে বলি অ-অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি। এভাবেই আমরা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যগুলো হারিয়ে ফেলছি।
এত সব হারানোর তালিকার মাঝে একজন গবেষক ও কর্মী হিসেবে নিজেকে হতাশ বা সন্দিহান হওয়া থেকে কীভাবে দূরে রাখেন?
উচ্ছেদ, পরিবেশের অবক্ষয়, প্রতিবেশগত সংকট এবং বর্তমানে তীব্র হতে থাকা জলবায়ু সংকট খুব কাছ থেকে দেখেছি আমি। একই সাথে আমি এমন সব মানুষ ও সম্প্রদায়ের কাছ থেকেও অনেক কিছু শিখেছি, যারা আমার জন্মের আগেই উচ্ছেদ ও ধ্বংসের মুখোমুখি হয়েছিল। তারা আমাকে পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্পর্কে বলেছিল। এই প্রকল্প কেবল চাকমা সম্প্রদায়কেই উচ্ছেদ করেনি, বরং সেখানকার প্রাকৃতিক সম্পদকেও ধ্বংস করেছে। এর ফলে গাছপালা, ফার্ন, মস, বন্যপ্রাণী এবং ঐতিহ্যবাহী জুম চাষের ধানও হারিয়ে গেছে।
বৈষম্য, যুদ্ধ, অস্ত্র শিল্প এবং ক্ষমতার রাজনীতি প্রতিবেশ ধ্বংসের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। নব্য-উদারবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানুষসহ গাছপালা, উদ্ভিদ, প্রাণী এবং সমস্ত জীবকে কেবল পণ্য হিসেবে বিবেচনা করে। এই চিন্তাভাবনা বা কাঠামো ভাঙতে না পারলে আমরা প্রকৃতির সাথে নতুন কোনো সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারব না।
আপনি যদি হতাশ হওয়ার কথা বলেন, তবে বলব, আমি মোটেও হতাশ নই। আমি হয়তো গাছপালা, মাটি বা মাছের ভাষা বুঝি না কিন্তু এমন অনেক আদিবাসী সম্প্রদায় আছে যারা তা বোঝে। তাদের প্রতিরোধ, চেতনা এবং জ্ঞান আমাকে আশাবাদী করে তোলে। এগুলোই আমাকে লেখালেখি চালিয়ে যাওয়ার এবং আমার কাজকে আরও বেশি প্রতিবেশ ও জনমুখী করার সাহস জোগায়।

গবেষণা সাধারণত বছরের পর বছর ধরে চলে, অন্যদিকে আন্দোলনের জন্য তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের প্রয়োজন হয়। বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সাথে আপনার কয়েক দশকের কাজগুলোর দিকে তাকালে কোন বিষয়টি আপনাকে সবচেয়ে বেশি সাফল্যের অনুভূতি দেয়? আর কোন কাজগুলো এখনও অসমাপ্ত রয়ে গেছে বলে মনে হয়?
আমি অংশগ্রহণমূলক অ্যাকশন রিসার্চের মাধ্যমে জন-উদ্ভিদ ও প্রতিবেশগত গবেষণা পরিচালনা করি। আমি যাদের সাথে কাজ করি, তারা কখনোই আমার গবেষণার নিছক ‘বস্তু’ বা অবজেক্ট নয়। আমরা সবাই এই প্রক্রিয়ার অংশ এবং আমি তাদের লড়াইকে নিজের বলে মনে করি। ২০০৪ সালে মধুপুর ইকো-পার্ক বিরোধী আন্দোলন শুরু হওয়ার ঠিক আগে আমার Biological Diversity of Madhupur Sal Forest বইটি প্রকাশিত হয়েছিল। এটি ইকো-পার্ক প্রকল্পের প্রতিবাদে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হয়ে উঠেছিল। কারণ এতে বনের জীববৈচিত্র্য এবং এর সাথে স্থানীয় সম্প্রদায়ের সম্পর্ক সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
আমি সবসময় ভাবি, কীভাবে আমার গবেষণা প্রতিবেশগত ন্যায়বিচারের আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। আমরা প্রতিবেশগত ন্যায়বিচারের জন্য লড়াই চালিয়ে গেলেও বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ এখনও এ আন্দোলনের অংশ হতে পারেনি। এর কারণ আমাদের স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনও মানবকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনায় আটকে আছে। আমাদের পাঠ্যপুস্তকগুলোতে প্রকৃতির সাথে মানুষের প্রতিবেশগত সম্পর্কের প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়।
কাজের তাগিদে আমি কখনো পত্রিকায় কলাম লিখি, কখনো একাডেমিক জার্নালের জন্য গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখি, কখনো বই লিখি, আবার কখনো নীতিনির্ধারক ও স্থানীয় সম্প্রদায়ের সাথে আমার কাজ নিয়ে আলোচনা করি। আমি যেসব সম্প্রদায়ের সাথে কাজ করি, আমার প্রতি তাদের আস্থা দীর্ঘদিনের যৌথ প্রচেষ্টার ফল; এটি একদিনে অর্জিত হয়নি। তবে এখনও অনেক বিষয় রয়েছে যা নিয়ে আমি গবেষণা করতে চাই।
ব্যানার ছবি: মাঠপর্যায়ে তথ্য নথিবদ্ধ করছেন পাভেল পার্থ। ছবি: পাভেল পার্থের সৌজন্যে।
সাক্ষাৎকারটি প্রথম প্রকাশিত হয় মঙ্গাবে গ্লোবাল– এ, ২০২৬ সালের ১৩ জুলাই।
সাইটেশন
Partha, P., & Hossain, A. E. (2007). Ethnobotanical investigation into the Mandi ethnic community in Bangladesh. Bangladesh Journal of Plant Taxonomy, 14(2), 129-145. doi:10.3329/bjpt.v14i2.532