দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে বাঘ শিকার ও পাচারের অভিযোগে কেউ গ্রেপ্তার হলেও, এদের মধ্যে অর্ধেকেরও কম শেষ পর্যন্ত দোষী সাব্যস্ত হন। অনেক সময় আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখিও হতে হয়না তাদের। ফলে অবৈধ চোরাই বাজার বুনো বাঘকে ঠেলে দিচ্ছে বিলুপ্তির দিকে। আর আইনি পদক্ষেপ কাজে আসছে খুবই সামান্য।
বাঘের বিচরণভূমি হিসেবে পরিচিত সাতটি দেশ ইন্দোনেশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার ও লাওস। ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এসব দেশে পাচারকারীদের হাত থেকে বাঘ উদ্ধারের ২৫৯টি ঘটনা বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকরা।
কানাডার সংরক্ষণ গবেষণা সংস্থা দ্য গার্ডিয়ান সেন্টার ফর কনজারভেশন রিসার্চ, বন্যপ্রাণী বাণিজ্য পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা TRAFFIC এবং WWF ইন্টারন্যাশনাল যৌথভাবে এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাদের তথ্য অনুযায়ী, ওই ২৫৯টি ঘটনার মধ্যে মাত্র ১১০টিতে আসামিদের কারাদণ্ড বা জরিমানা হয়েছে।
এছাড়া আরও ৩৫টি মামলায় আসামিদের আইনি প্রক্রিয়া স্থগিত করে আদালত। অন্যদিকে ৬৩টি মামলায় গ্রেপ্তারের কোনো স্পষ্ট ফলাফল জানা যায়নি, আর বাকি ৪৮টি ঘটনার ক্ষেত্রে কোনো তথ্যই প্রকাশ করা হয়নি জনসমক্ষে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মূলত নিচু ও মাঝারি স্তরের শিকারী, পাচারে জড়িত ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ওপরই বেশি তৎপর আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো। আন্তঃদেশীয় অপরাধ চক্রের পেছনে অর্থ যোগানদাতা শীর্ষ পর্যায়ের হোতাদের বিরুদ্ধে আইনের প্রয়োগ নেই বললেই চলে।
WWF-এর বাঘ বাণিজ্য বিষয়ক প্রধান ও প্রতিবেদনের সহলেখক হিদার সোল মঙ্গাবে-কে বলেন, “আমরা গুরুতর এক সংঘবদ্ধ অপরাধের কথা বলছি”।
“এগুলো এমন এক ধরনের অপরাধ চক্র, যা মানব পাচার ও অর্থ পাচারের মতো অন্যান্য সংঘবদ্ধ অপরাধের সঙ্গেও জড়িত।”
অপরাধীদের শুধু গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়, সে কথা স্মরণ করিয়ে দেন সোল। তিনি আরও বলেন, “কঠোরভাবে আইনি পদক্ষেপ নিতে হলে যথাযথ তদন্ত এবং তথ্যপ্রমাণসহ মামলা সাজানো প্রয়োজন। আর সমগ্র ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার পুরো প্রক্রিয়ার দিকে নজর দিয়েই আমরা বন্যপ্রাণী পাচারের এই নেটওয়ার্কগুলোকে সত্যিকারের অর্থে গুঁড়িয়ে দিতে পারবো।”
কারাদণ্ড বা জরিমানার মাধ্যমে দোষী সাব্যস্ত করার তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া। উভয় দেশেই এমন মামলার সংখ্যা ৫১টি করে। তবে পুরো অঞ্চলে মোট ৩৫টি স্থগিত কারাদণ্ডের মধ্যে ৩৩টিই ছিল ভিয়েতনামে।
পর্যালোচিত দেশগুলোর মধ্যে থাইল্যান্ডে ৩৬টি এবং মালয়েশিয়ায় ৩৫টি গ্রেপ্তারের ঘটনা নথিবদ্ধ ছিলো। তবে এর মধ্যে অপরাধীদের কারাদণ্ড হওয়ার ঘটনা ঘটেছে যথাক্রমে মাত্র ৫টি ও ৯টি ক্ষেত্রে।
কম্বোডিয়া ও লাওসে অপরাধীদের সাজা নিশ্চিত করার নজির মিলেছে মাত্র একটি করে ঘটনায়। অন্যদিকে মিয়ানমারে এমন একটি ঘটনারও তথ্য মেলেনি।
দ্য গার্ডিয়ান সেন্টার ফর কনজারভেশন রিসার্চ-এর নির্বাহী পরিচালক ও প্রতিবেদনের প্রধান লেখক র্যাচেল বোরাত্তো। তিনি মঙ্গাবে-কে জানান “অন্য দেশগুলোর কয়েকটিতে আসলে কী ঘটছে সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সত্যিই কঠিন, কারণ বিচারের বিষয়ে সেখানে কোনো স্বচ্ছতাই নেই।” বোরাত্তো আরও উল্লেখ করেন, কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে মামলা নিষ্পত্তি না হলে বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত আইনগুলো শেষ পর্যন্ত কেবল “কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ”।
বুনো বিড়ালজাতীয় প্রাণী সংরক্ষণ বিষয়ক অলাভজনক সংস্থা প্যানথেরার পাচার দমন বিষয়ক প্রধান চ্যাস বার্নস জানান, অপরাধের মূল হোতাদের বিচারের আওতায় আনতে না পারলে সংরক্ষণের সার্বিক লক্ষ্যই ভেস্তে যেতে পারে।
“দুর্বল আইন প্রয়োগ কিংবা লঘু শাস্তি অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ (সংরক্ষণমূলক) পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তাকে খাটো করে,” মন্তব্য করেন বার্নস । তিনি আরও বলেন, “চক্রগুলোকে পুরোপুরি অচল করে দেওয়ার ক্ষেত্রে সবসময় নিচু ও মাঝারি স্তরের অপরাধীদের লক্ষ্য বানানো কার্যকর পথ নয়।”
শন মোব্রের পুরো প্রতিবেদনটি পড়ুন এখানে।
ব্যানার ছবি: ইন্দোনেশিয়ায় সুমাত্রান একটি বাঘ (Panthera tigris sondaica)। ছবি: রেট এ. বাটলার/মঙ্গাবে।